ঢাকা    সোমবার, ০১ জুন ২০২৬
ঢাকা    সোমবার, ০১ জুন ২০২৬
গণবার্তা

সাবেক মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের বর্ষীয়ান নেতা তোফায়েল আহমেদ আর নেই

সাবেক মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের বর্ষীয়ান নেতা তোফায়েল আহমেদ আর নেই

সাবেক মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের বর্ষীয়ান নেতা তোফায়েল আহমেদ মারা গেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। সোমবার (১ জুন) বিকেলে সাড়ে ৩টার দিকে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮২ বছর।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও পরিবারের পক্ষ থেকে গণমাধ্যমকে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। প্রবীন এ রাজনীতিবিদ দীর্ঘদিন ধরে প্যারালাইজডসহ অন্যান্য শারীরিক সমস্যায় ভুগছিলেন। গুরুতর অবস্থায় গত ২৮ সেপ্টেম্বর তাকে স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানেই তিনি লাইফ সাপোর্টে ছিলেন।

রাজনৈতিক জীবন

তোফায়েল আহমেদ ১৯৪৩ সালের ২২ অক্টোবর ভোলা সদর উপজেলার দক্ষিণ দিঘলদী ইউনিয়নের কোড়ালিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৬৭ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি ছিলেন। ৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্বস্থানীয় ভূমিকা রেখে দেশজুড়ে পরিচিতি পান তিনি। 

ইতিহাসের পাতায় শহীদ আব্দুল মালেকের হত্যাকাণ্ড একটি আলোচিত ঘটনা। ১৯৬৯ সালের ১২ আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি সেমিনারকে কেন্দ্র করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়। ওই সেমিনারে ইসলামী শিক্ষা ব্যবস্থার পক্ষে বক্তব্য রাখেন তৎকালীন ইসলামী ছাত্রসংঘের নেতা আব্দুল মালেক। তার বক্তব্যের বিপক্ষে অবস্থান নেন ছাত্রলীগ ও বাম সংগঠনের নেতারা।

অভিযোগ রয়েছে, সেমিনার শেষে বের হওয়ার সময় তৎকালীন ডাকসু ভিপি তোফায়েল আহমেদের নেতৃত্বে একদল হামলাকারী আব্দুল মালেকের ওপর হামলা চালায়। এতে তিনি গুরুতর আহত হন এবং উন্নত চিকিৎসার জন্য পশ্চিম পাকিস্তানে নেওয়া হলে ১৫ আগস্ট ১৯৬৯ সালে মারা যান। এই ঘটনায় তোফায়েল আহমেদ, রাশেদ খান মেনন ও হাসানুল হক ইনুর নাম উল্লেখ করা হয়।

তোফায়েল আহমেদ আজীবন এই অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছেন। ঘটনার পর ইসলামী ছাত্রসংঘের বর্তমান উত্তসূরি ইসলামী ছাত্রশিবির ১৫ আগস্টকে ‘ইসলামী শিক্ষা দিবস’ হিসেবে পালন করে আসছে।

১৯৭০ সালের নির্বাচনে মাত্র ২৭ বছর বয়সে তোফায়েল আহমেদ পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি নয়বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। একাধিকবার মন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি আওয়ামী লীগের (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য ছিলেন।

রাজনৈতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি অধ্যায়ের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে তোফায়েল আহমেদের নাম। ছাত্র আন্দোলন, গণ-অভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ, সংসদীয় রাজনীতি ও মন্ত্রিসভা—প্রতিটি ক্ষেত্রেই রেখে গেছেন নিজের স্বাক্ষর। 

ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানে তার নেতৃত্ব তাকে জাতীয় পরিচিতি এনে দেয়। কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের মাধ্যমে তিনি লাখো জনতার সম্মেলনে শেখ মুজিবকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি ঘোষণা দেন।

মুক্তিযুদ্ধ ও সংসদীয় রাজনীতি

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে তিনি মুজিব বাহিনীর অঞ্চলভিত্তিক দায়িত্বপ্রাপ্ত চার প্রধানের একজন ছিলেন। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ১৪ জানুয়ারি প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক সচিবের দায়িত্ব লাভ করেন।

আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে ভোলা থেকে ১৯৭৩, ১৯৮৬, ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০৮, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়লাভ করেন। ১৯৯৬ সালে তিনি শেখ হাসিনা সরকারের শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। পরবর্তীতে ২০১৩-১৮ সাল পর্যন্ত দুই মেয়াদে বাণিজ্যমন্ত্রী ছিলেন।

রাজনৈতিক কারণে ১৯৭৫ সাল থেকে টানা ৩৩ মাস-সহ অসংখ্যবার কারাভোগ করেন এই নেতা। পরিবার সূত্রে জানা গেছে, মৃত্যুকালে তিনি এক মেয়েসহ অসংখ্য শুভানুধ্যায়ী রেখে গেছেন।

আপনার মতামত লিখুন

গণবার্তা

সোমবার, ০১ জুন ২০২৬


সাবেক মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের বর্ষীয়ান নেতা তোফায়েল আহমেদ আর নেই

প্রকাশের তারিখ : ০১ জুন ২০২৬

featured Image
সাবেক মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের বর্ষীয়ান নেতা তোফায়েল আহমেদ মারা গেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। সোমবার (১ জুন) বিকেলে সাড়ে ৩টার দিকে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮২ বছর।হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও পরিবারের পক্ষ থেকে গণমাধ্যমকে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। প্রবীন এ রাজনীতিবিদ দীর্ঘদিন ধরে প্যারালাইজডসহ অন্যান্য শারীরিক সমস্যায় ভুগছিলেন। গুরুতর অবস্থায় গত ২৮ সেপ্টেম্বর তাকে স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানেই তিনি লাইফ সাপোর্টে ছিলেন।রাজনৈতিক জীবনতোফায়েল আহমেদ ১৯৪৩ সালের ২২ অক্টোবর ভোলা সদর উপজেলার দক্ষিণ দিঘলদী ইউনিয়নের কোড়ালিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৬৭ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি ছিলেন। ৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্বস্থানীয় ভূমিকা রেখে দেশজুড়ে পরিচিতি পান তিনি। ইতিহাসের পাতায় শহীদ আব্দুল মালেকের হত্যাকাণ্ড একটি আলোচিত ঘটনা। ১৯৬৯ সালের ১২ আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি সেমিনারকে কেন্দ্র করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়। ওই সেমিনারে ইসলামী শিক্ষা ব্যবস্থার পক্ষে বক্তব্য রাখেন তৎকালীন ইসলামী ছাত্রসংঘের নেতা আব্দুল মালেক। তার বক্তব্যের বিপক্ষে অবস্থান নেন ছাত্রলীগ ও বাম সংগঠনের নেতারা।অভিযোগ রয়েছে, সেমিনার শেষে বের হওয়ার সময় তৎকালীন ডাকসু ভিপি তোফায়েল আহমেদের নেতৃত্বে একদল হামলাকারী আব্দুল মালেকের ওপর হামলা চালায়। এতে তিনি গুরুতর আহত হন এবং উন্নত চিকিৎসার জন্য পশ্চিম পাকিস্তানে নেওয়া হলে ১৫ আগস্ট ১৯৬৯ সালে মারা যান। এই ঘটনায় তোফায়েল আহমেদ, রাশেদ খান মেনন ও হাসানুল হক ইনুর নাম উল্লেখ করা হয়।তোফায়েল আহমেদ আজীবন এই অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছেন। ঘটনার পর ইসলামী ছাত্রসংঘের বর্তমান উত্তসূরি ইসলামী ছাত্রশিবির ১৫ আগস্টকে ‘ইসলামী শিক্ষা দিবস’ হিসেবে পালন করে আসছে।১৯৭০ সালের নির্বাচনে মাত্র ২৭ বছর বয়সে তোফায়েল আহমেদ পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি নয়বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। একাধিকবার মন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি আওয়ামী লীগের (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য ছিলেন।রাজনৈতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি অধ্যায়ের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে তোফায়েল আহমেদের নাম। ছাত্র আন্দোলন, গণ-অভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ, সংসদীয় রাজনীতি ও মন্ত্রিসভা—প্রতিটি ক্ষেত্রেই রেখে গেছেন নিজের স্বাক্ষর। ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানে তার নেতৃত্ব তাকে জাতীয় পরিচিতি এনে দেয়। কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের মাধ্যমে তিনি লাখো জনতার সম্মেলনে শেখ মুজিবকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি ঘোষণা দেন।মুক্তিযুদ্ধ ও সংসদীয় রাজনীতি১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে তিনি মুজিব বাহিনীর অঞ্চলভিত্তিক দায়িত্বপ্রাপ্ত চার প্রধানের একজন ছিলেন। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ১৪ জানুয়ারি প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক সচিবের দায়িত্ব লাভ করেন।আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে ভোলা থেকে ১৯৭৩, ১৯৮৬, ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০৮, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়লাভ করেন। ১৯৯৬ সালে তিনি শেখ হাসিনা সরকারের শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। পরবর্তীতে ২০১৩-১৮ সাল পর্যন্ত দুই মেয়াদে বাণিজ্যমন্ত্রী ছিলেন।রাজনৈতিক কারণে ১৯৭৫ সাল থেকে টানা ৩৩ মাস-সহ অসংখ্যবার কারাভোগ করেন এই নেতা। পরিবার সূত্রে জানা গেছে, মৃত্যুকালে তিনি এক মেয়েসহ অসংখ্য শুভানুধ্যায়ী রেখে গেছেন।

গণবার্তা

সম্পাদকঃ নূর মোহাম্মদ
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্ব সংরক্ষিত গণবার্তা