লালমনিরহাটের আদিতমারীতে ভুট্টাখেত থেকে বস্তাবন্দী অবস্থায় নিখোঁজ প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী নন্দিনী রাণীর (৭) মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। এ ঘটনায় জড়িত থাকার সন্দেহে বিক্ষুব্ধ জনতা বাবা-ছেলেকে অবরুদ্ধ করে তাদের বাড়িঘরে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করেছে।
মঙ্গলবার সকালে ফলিমারী গ্রামের একটি ভুট্টাখেত থেকে শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এর আগে সোমবার বিকেলে সে নিখোঁজ হয়। পরিবারের সদস্য ও স্থানীয়দের অভিযোগ, শিশুটিকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রতিদিনের মতো সোমবার বিকেলে খেলতে বের হয় নন্দিনী। সন্ধ্যা পর্যন্ত বাড়িতে না ফেরায় পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। সারা রাত খোঁজ করেও তার সন্ধান মেলেনি।
মঙ্গলবার সকালে স্থানীয়রা গ্রামের জাবেদ আলীর ভুট্টাখেতে ভাঙা গাছ দেখে সন্দেহ করেন। পরে খেতের ভেতরে একটি গর্ত দেখতে পেয়ে সেখানে অনুসন্ধান চালালে বস্তাবন্দী অবস্থায় মাটিচাপা দেওয়া শিশুটির মরদেহ পাওয়া যায়। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে মরদেহ উদ্ধার করে।
শিশুটির বাবা নলিনী বর্মণ বলেন, ‘আমার সঙ্গে কারও কোনো বিরোধ নেই। আমি একজন কৃষক। আমার মেয়েকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। আমি এর বিচার চাই।’
শিশুটির মা সাবিত্রী রানী কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, ‘প্রতিদিনের মতো সেদিনও নন্দিনী বিকেলে খেলতে বের হয়েছিল। কে বা কারা তাকে নিয়ে গেছে, তা আমরা জানি না। আমি আমার মেয়ের হত্যার বিচার চাই।’
এ ঘটনায় জড়িত থাকার সন্দেহে স্থানীয়রা একই এলাকার বিধান চন্দ্র বর্মণ (২৫) ও তার বাবা রণজিৎ চন্দ্র বর্মণকে (৫৫) অবরুদ্ধ করে রাখেন। এলাকাবাসী নন্দিনী রাণীর হত্যাকারী সন্দেহে ওই দুই ব্যক্তির বাড়িঘর ভাঙচুর করে এবং আগুন ধরিয়ে দেয়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, ঘটনার পর থেকেই এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছিল। সকালে মরদেহ উদ্ধারের পর স্থানীয়রা রণজিৎ ও বিধানের বাড়িতে গিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। তাদের একজনকে অবরুদ্ধ করে রাখা হয় এবং অন্য জনকে বাড়ির ভেতর আটকে রেখে বাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। তাৎক্ষণিকভাবে তারা বের হতে পারেননি বলে জানিয়েছেন প্রতিবেশীরা।
পুলিশ ও বিজিবি সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করেন। এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত অভিযুক্ত দুই ব্যক্তিকে থানায় নেওয়া সম্ভব হয়নি। ঘটনাস্থলে লালমনিরহাটের পুলিশ সুপার ও বিজিবির অধিনায়ক উপস্থিত রয়েছেন।
আদিতমারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজমুল হক বলেন, ‘খবর পেয়ে আমরা ঘটনাস্থলে পৌঁছাই। মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর কারণ এবং হত্যার আগে কোনো ধরনের নির্যাতন বা ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যাবে। বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। ঘটনাটি গুরুত্বসহকারে তদন্ত করা হচ্ছে।’
তিনি আরও জানান, পুলিশ শিশুটির মৃত্যুর কারণ উদঘাটনে কাজ করছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, শিশুটিকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে। তবে ময়নাতদন্তের পরই সঠিক কারণ জানা যাবে।
শিশু নন্দিনী রাণীর এই মর্মান্তিক মৃত্যুতে পুরো আদিতমারী এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। স্থানীয়রা শিশুটির জন্য বিচার দাবি করে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছেন। সমাজকর্মী ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো দ্রুত বিচার এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে।
ফলিমারী গ্রামের বাসিন্দারা বলেন, ‘এত ছোট একটি শিশুকে এভাবে হত্যা করা কোনো মানুষ করতে পারে না। আমরা অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে প্রশাসনের সাহায্য চাই।’
ঘটনার পর এলাকায় বাড়তি পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
সর্বশেষ পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, নন্দিনী রাণীর মরদেহ লালমনিরহাট সদর হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে। আগামীকাল ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে। এ ঘটনায় আদিতমারী থানায় মামলার প্রস্তুতি চলছে।

বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৬ জুন ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন