ভারতের প্রতিরক্ষা বাহিনীতে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হচ্ছে সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি নজরদারি যুদ্ধবিমান ‘নেত্র’। সামরিক ব্যবহারের জন্য প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে বিমানটিকে অপারেশনাল ক্লিয়ারেন্স বা চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে। বৃহস্পতিবার ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন ডিআরডিও ‘নেত্র’ অ্যাওয়াক্স সিস্টেমকে ফাইনাল অপারেশনাল ক্লিয়ারেন্স দিয়েছে। বেঙ্গালুরুর সেন্টার ফর এয়ারবর্ন সিস্টেমসে এক অনুষ্ঠানে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতীয় বিমানবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়। ‘নেত্র’ মূলত একটি অ্যাওয়াক্স (এয়ারবোর্ন আর্লি ওয়ার্নিং অ্যান্ড কন্ট্রোল সিস্টেম) বিমান। শত্রুপক্ষের বিমানের গতিবিধি নজরদারি করা এবং যুদ্ধের সময় নিজস্ব যুদ্ধবিমানের স্কোয়াড্রনকে নিয়ন্ত্রণ করাই এর প্রধান কাজ। এতে রয়েছে অত্যাধুনিক এমব্রেয়ার ইআরজে-১৪৫ রাডার সিস্টেম, যা বিশ্বের অন্যতম সেরা বলে বিবেচিত। ডিফেন্স রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (ডিআরডিও) জানিয়েছে, ‘নেত্র’ ৪৫০ থেকে ৫০০ কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তু ট্র্যাক করতে সক্ষম। এতে ইলেকট্রনিক ইন্টেলিজেন্স সুবিধা থাকায় যুদ্ধক্ষেত্রে আকাশ থেকে সরাসরি স্থলবাহিনীর কাছে লাইভ তথ্য পাঠানো যাবে।
ইসরায়েলের ‘ফ্যালকন’ অ্যাওয়াক্সের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, ফ্যালকন মাত্র ৩৬ ডিগ্রি ক্ষেত্র নজরদারি করতে পারে, যেখানে নেত্রের নজরদারির পরিধি ২৪০ ডিগ্রি। অর্থাৎ অনেক বড় এলাকা একসঙ্গে নজরে রাখতে পারবে এই দেশীয় বিমান। প্রসঙ্গত, কয়েক বছর আগে ভারত ইসরায়েল থেকে তিনটি ফ্যালকন অ্যাওয়াক্স কিনেছিল প্রায় ৮ হাজার ১০৭ কোটি টাকায়। এগুলো আইএল-৭৬ বিমানে বসানো হয়েছে। বালাকোট হামলাসহ বিভিন্ন অভিযানে এই ফ্যালকন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। গত বছর ‘অপারেশন সিঁদুর’-এ এর ব্যবহার হয়েছে বলে জানা যায়। কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই অভিযানের সময় ‘নেত্র’কেও অঘোষিতভাবে পরীক্ষা করে দেখেছে ভারতীয় বাহিনী। ডিআরডিওর এই সাফল্যকে ভারতীয় প্রতিরক্ষা খাতে আরেকটি বড় মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে। ‘নেত্র’ যুক্ত হওয়ায় ভারত এখন আকাশসীমায় নজরদারি ও যুদ্ধ নিয়ন্ত্রণে আরও স্বনির্ভর হবে।
এয়ার মার্শাল অবধেশ কুমার ভারতী, ডেপুটি চিফ অফ দ্য এয়ার স্টাফ, এই বিমানটির অপারেশনাল সক্ষমতার প্রশংসা করে বলেন, ‘নেত্র ভারতীয় বিমানবাহিনীর জন্য একটি গেম-চেঞ্জার হতে চলেছে। এটি শুধু আমাদের নজরদারি ক্ষমতা বাড়াবে না, বরং আক্রমণাত্মক ও প্রতিরক্ষামূলক উভয় অভিযানে সহায়তা করবে।’ ডিআরডিওর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই বিমানের রাডার সিস্টেম এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যে এটি শত্রুর স্টিলথ বিমানও শনাক্ত করতে পারে। এছাড়া বড় ধরনের যুদ্ধের সময় এটি একাধিক যুদ্ধবিমানের সমন্বয় সাধন করতে পারবে। ‘নেত্র’-এর সফল অপারেশনাল ক্লিয়ারেন্স ভারতের প্রতিরক্ষা খাতে ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ উদ্যোগের একটি বড় অর্জন বলে মন্তব্য করেছেন প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেছেন, এটি বিদেশি অস্ত্রের ওপর ভারতের নির্ভরশীলতা কমাবে এবং দেশীয় শিল্পকে উৎসাহিত করবে। আগামী কয়েক বছরের মধ্যে ভারতীয় বিমানবাহিনী আরও কয়েকটি ‘নেত্র’ বিমান সংগ্রহ করবে বলে জানা গেছে। ইতিমধ্যে দ্বিতীয় প্রোটোটাইপ তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। ভারতের এই সাফল্য দক্ষিণ এশিয়ার সামরিক ভারসাম্যে নতুন প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে প্রতিবেশী দেশগুলোর কাছে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা যে ভারত এখন আকাশ পর্যবেক্ষণে আরও স্বনির্ভর ও শক্তিশালী। ‘নেত্র’ এখন আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতীয় বিমানবাহিনীর বহরে যুক্ত হয়েছে এবং এটি আগামী দিনে ভারতের সামরিক অভিযানগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

রোববার, ২৮ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৭ জুন ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন