সিন্ধু পানিবণ্টন চুক্তি অনুযায়ী নিজেদের ন্যায্য অংশ আদায়ে পাকিস্তানের বেসামরিক সরকারের পর এবার দেশটির সামরিক বাহিনীও সম্ভাব্য সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার জোরালো অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে। গত বছর কাশ্মীরের পহেলগামে একটি ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলায় ছাব্বিশ জন নিহতের ঘটনায় ভারত ১৯৬০ সালের এই ঐতিহাসিক চুক্তিটি সাময়িকভাবে স্থগিত করার পর দুই পারমাণবিক প্রতিবেশীর মধ্যে উত্তেজনা তুঙ্গে উঠেছে।
পাকিস্তানের পিপলস পার্টির চেয়ারম্যান বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এক ভিডিও বার্তায় ভারতের বিরুদ্ধে প্রয়োজনে সব ফ্রন্টে যুদ্ধ করার সরাসরি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। ইসলামাবাদে ডিফেন্স ফোর্সেস চিফ ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত শীর্ষ সেনা কর্মকর্তাদের ২৭৬তম কোর কমান্ডার্স কনফারেন্সে এই বিষয়ে কঠোর অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করা হয়। আইএসপিআর এক বিবৃতিতে জানিয়েছে যে সরকারি নির্দেশনা ও জনগণের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী পাকিস্তানের পানির ন্যায্য অধিকার রক্ষায় সেনাবাহিনী সম্পূর্ণ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এই বৈঠকে গত বছরের ২৪ এপ্রিল গৃহীত পাকিস্তানের ন্যাশনাল সিকিউরিটি কমিটি বা এনএসসি-এর বিশেষ নির্দেশনার আলোকে কৌশলগত প্রস্তুতি পর্যালোচনা করা হয়। পাকিস্তানের এনএসসি তাদের নীতিমালায় ভারতের পক্ষ থেকে সিন্ধু নদের পানি প্রবাহ বন্ধ বা ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার যেকোনো চেষ্টাকে সরাসরি ‘যুদ্ধের শামিল’ হিসেবে গণ্য করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ওই উচ্চপর্যায়ের ফোরামে দেশের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিবেশ এবং সশস্ত্র বাহিনীর যুদ্ধ প্রস্তুতির ওপর সন্তোষ প্রকাশ করা হয়। একই সঙ্গে আফগান তালেবান নিয়ন্ত্রিত ভূখণ্ড ব্যবহার করে পাকিস্তানের ভেতরে সন্ত্রাসী হামলা চালানোর বিষয়ে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করে অপারেশন গজব-লিল-হক এর অধীনে গোয়েন্দা ভিত্তিক অভিযান অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়। এনএসসি-এর বৈঠকে কাশ্মীরের জনগণের প্রতি পাকিস্তানের কূটনৈতিক, রাজনৈতিক ও নৈতিক সমর্থন অব্যাহত রাখার বিষয়টিও পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির বর্তমানের প্রথাগত ও হাইব্রিড হুমকি মোকাবিলায় বাহিনীর কমান্ডারদের সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। অন্যদিকে পিপলস পার্টির এক জনসভায় বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারি ভারতকে পানিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের চেষ্টার দায়ে অভিযুক্ত করে বলেন, ‘সিন্ধু জলবণ্টন চুক্তি নিয়ে কোনো আপস করা হবে না এবং ভারতের সঙ্গে যুদ্ধ করতে হলে আমরা যুদ্ধই করব’।
পাকিস্তানের এই হুঁশিয়ারির জবাবে নতুন দিল্লির পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানানো হয়েছে যে সীমান্ত পারের সন্ত্রাসবাদে ইসলামাবাদের ক্রমাগত মদদ জোগানোর কারণেই সিন্ধু জলবণ্টন চুক্তিটি স্থগিত রাখা হয়েছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল এক বিবৃতিতে বলেছেন যে পাকিস্তানকে অবশ্যই নির্ভরযোগ্য ও স্থায়ীভাবে আন্তঃসীমান্ত সন্ত্রাসবাদের পথ পরিহার করতে হবে। পহেলগাম হামলার পর থেকে ভারতের অবস্থান অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট যে বর্তমানের বৈরী বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে কোনো আন্তর্জাতিক দ্বিপক্ষীয় চুক্তি এককভাবে চলতে পারে না। বিশ্বব্যাংকের মধ্যস্থতায় ১৯৬০ সালে স্বাক্ষরিত এই চুক্তি অনুযায়ী পূর্বের তিনটি নদী রাভি, সুতলেজ ও বিয়াসের নিয়ন্ত্রণ ভারতের হাতে এবং পশ্চিমের তিনটি নদী সিন্ধু, ঝিলাম ও চেনাবের পানি পাকিস্তানের ব্যবহারের জন্য নির্ধারিত ছিল। এই চুক্তির আওতায় অববাহিকার উজান দেশে থাকা ভারত প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে পাকিস্তানকে বন্যার আগাম সতর্কবার্তা জানাত। চুক্তিটি বর্তমানে স্থগিত থাকায় নতুন দিল্লি এখন আর সেই তথ্য শেয়ার করতে বাধ্য নয় এবং ভারত ওই অববাহিকায় সাওয়ালকোট, রাতলে, বুড়সার, পাকাল দুল, কাওয়ার, কিরু এবং কিরথাই প্রকল্পের মতো বেশ কয়েকটি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের কাজ দ্রুত এগিয়ে নিচ্ছে। পাকিস্তানের সামগ্রিক কৃষিব্যবস্থার প্রায় আশি থেকে নব্বই শতাংশ সরাসরি সিন্ধু নদ ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল হলেও দেশটির পানি ধারণক্ষমতা মাত্র এক মাসের প্রবাহের সমান। পাকিস্তানের প্রধান দুটি জলাধার তারবেলা এবং মাংলা বর্তমানে প্রায় মৃত স্তরে পৌঁছানোয় ভারতের এই পদক্ষেপ দেশটির জন্য একটি বড় কৌশলগত চাপের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই কারণে চরম উদ্বিগ্ন হয়ে পড়া পাকিস্তান গত এক বছরে বিভিন্ন দেশে প্রতিনিধি দল পাঠানো, জাতিসংঘে চিঠি দেওয়া এবং আন্তর্জাতিক আদালতে আইনি প্রক্রিয়া শুরু করাসহ নানামুখী কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। সূত্র: এনডিটিভি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এই পরিস্থিতিতে উভয় দেশেরই সংযত থাকা উচিত। আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানই উত্তম পথ। অন্যথায় এই উত্তেজনা দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও এই পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন। তারা উভয় দেশকে শান্তিপূর্ণভাবে সমস্যা সমাধানের আহ্বান জানিয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো পক্ষই তাদের অবস্থান থেকে সরে আসেনি। পাকিস্তান তার পানির অধিকার রক্ষায় যে কোনো পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত। অন্যদিকে ভারত বলছে, সন্ত্রাসবাদ বন্ধ না হলে চুক্তি স্থগিত থাকবে। এই অচলাবস্থা কাটিয়ে ওঠা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। আগামী দিনগুলোতে এই পরিস্থিতি কীভাবে অগ্রসর হয়, সেদিকে সবার নজর থাকবে। উভয় দেশের উচিত যুদ্ধের পথ না বেছে নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খোঁজা। যুদ্ধ কখনোই কোনো সমস্যার স্থায়ী সমাধান নয়। এটি শুধু ধ্বংস ও দুর্ভোগ ডেকে আনে। তাই সব পক্ষকেই শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার চেষ্টা করতে হবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত এই বিষয়ে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করা। তাহলেই এই সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে।

মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৭ জুলাই ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন