আলোচিত আরিচা ঘাটে দীর্ঘশ্বাসের বসতি




সাাইফুদ্দিন আহমেদ নান্নু ।
১৯৬৩ সালের ৩১ মার্চ ,আরিচা ফেরীঘাটের জন্ম। এ দিন একটি মাত্র ফেরী, মাত্র একটি গাড়ি নিয়ে  আরিচা ঘাট থেকে নগরবাড়ি পৌঁছেছিল । ফেরীটির নাম ছিল ‘কর্ণফুলি’। ফেরীপারের জন্য ঐ গাড়িটিকে ভাড়া দিতে হয়েছিল পঁচাত্তর পয়সা । দক্ষিণাঞ্চলের ৩৬ এবং উত্তরাঞ্চলের ১৬ টি জেলার মানুষ আর গাড়ির ভীড়ে কালেকালে ভরে উঠেছিল আরিচা। শেষ দিকে এসে আরিচা ফেরী বহরে কর্ণফুলির সাথে যুক্ত হয়েছিল ১২ টি  আধুনিক রো-রো ফেরী সহ মোট ২৮ টি ফেরী। এক সময়  রাজধানীীর প্রবেশদ্বার বলে ডাকা  হত আরিচা ঘাটকে। সে সময় দেশের উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গের  যানবাহন আরিচা ঘাট হয়েই রাজধানী ঢাকায় আসা যাওয়া করতো,এ পথের কোন বিকল্প ছিলনা। আরিচার ভরা যৌবনে প্রতিদিন গড়ে ঘাট পেরুতো আড়াই থেকে তিন হাজার গাড়ি। ফেরীঘাটের সাথে ছিল লঞ্চঘাটও। এ ঘাট দুটো দিয়ে প্রতিদিন দূর-দূরান্তের ৪৫ থেকে ৫০ হাজার মানুষ চলাচল করতো।  হকার এবং কুলির সংখ্যা ছিল আড়াই হাজারের উপরে। জমজমাট হোটেল রেস্টুরেন্টের সংখ্যা ছিল ৩শয়েরও বেশী। আবাসিক বোর্ডিং ছিল ১২০ থেকে ১২৫ টির মত। আরিচা ঘাটকে ঘিড়ে কর্মসংস্থান হয়েছিল ১০ হাজারেরও বেশী মানুষের। হাজার হাজার গাড়ির ভয়াবহ যানজট,যাত্রী দুর্ভোগ,গাড়ির লম্বা লাইনের ছবি-নিউজ ছিল সংবাদপত্রের হটকেক আইটেম। যানজটে আটকে গাড়িতেই সন্তান প্রসব,বাড়ির বদলে ঘাটেই ঈদের নামাজ পড়তে বাধ্য হবার মত অসংখ্য ঘটনায় আরিচা ঘাট আলোড়ন তুলেছিল একাধিকবার। তেমনি দেশজুড়ে হইচই পরেছিল ফেরীঘাটের হোটেলে কুকুরের মাংস বিক্রির ঘটনা ফাঁস হয়ে যাওয়ায়, ছিল আরিচার পাঙ্গাস আর ইলিশের কদর, সবই আজ অতীত,কেবলই ইতিহাস।
আরিচা ঘাট ঃ কফিনে শেষ  পেরেক
১৯৬৩ তে জন্ম নেয়া আরিচা ঘাটের কফিন সাজানো হয়েছিল ১৯৯৭ সালে। এ সনেই খুলে দেয়া হয়েছিল বংগবন্ধু যমুনা সেতুর দ্বার। এরপর থেকে এ পথ মাড়ায়নি দেশের উত্তরাঞ্চলের যানবাহন। পাশাপাশি  ঢাকা-মাওয়া সড়ক ভাগ বসায় দক্ষিণাঞ্চলের যানবাহনে। ফলে একবারে শূন্য হয়ে উঠে আরিচার চাপ। তবে কফিনের শেষ পেরেকটি ঠোঁকা হয় ২০০২ এর ১৫ নভেম্বর। এই দিন সকাল ১০টা সাড়ে ১০টা,আরিচা ফেরী ঘাটের শেষ ২টি পন্টুন টাগবোট দিয়ে টেনে সড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হয় ৯ কিলোমিটার ভাটিতে পাটুরিয়ায়। সবার অলক্ষ্যে পর্দা নামে অর্ধশতাব্দীর আলোচিত উপাখ্যানের। মুছে যায় আরিচা ফেরীঘাট শব্দবদ্ধ নামটি।
অরিচা ঃ বঙ্গবন্ধুর জলধর মিস্টান্ন ভা-ার
আরিচা ঘাটের সারবাঁধা হোটেল রেস্টুরেন্টের অনেকগুলো এখনো টিকেআছে,তবে ভিন্ন নামে,ভিন্ন পরিচয়ে। কোনটার দেয়ালের পলেস্তরা উঠে গেছে,দেয়ালে জমেছে শ্যাওলা। টিনের কাঠারা করা ঘড়, তার অনেকগুলোতে জমে আছে মাকড়সার জাল,কালি-ঝুঁলি।যেন প্রাণহীন মৃত কোন অচিন নগরী। কাকডাকা ভোর থেকে রাত্রি দ্বিপ্রহর, হাজারো মানুষ হোটেলে রেস্টুরেন্টে রুটি-পরোটা,গরম ভাত,ইলিশ-ঝোল,পাঙ্গাশের পেটি,হকার ফেরীওয়ালার, অবিরাম ব্যস্ততা এখন রূপকথা। মিষ্টির দোকান ও ছিল বেশ ক’টি। এর মধ্যে জলধর মিষ্টান্ন ভা-ার ছিল বিখ্যাত। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু  শেখ মুজিবর রহমানের সাথে জলধর বাবুর সখ্যের গল্প এখনো আছে, গোপালগঞ্জ যাবার পথে আরিচা ঘাটে নেমেই বঙ্গবন্ধু খোঁজ করতেন তাঁর। ঘাটের মিষ্টির দোকান, হোটেল রেস্টুরেন্টের  প্রায় সবই আজ বন্ধ। যৌবন-জৌলুশ হারিয়েছে মোহাম্মদিয়া হোটেল,ইসলামিয়া হোটেল,ভাইভাই হোটেল,ভাগ্যলক্ষ্মী হোটেল,যমুনা বিরিয়ানী হাউস । হাতে গোনা ৮/১০ টি হোটেল রেস্টুরেণ্ট চলছে ধুকধুকিয়ে। বাদবাকি হোটেল বদলে হয়েছে মুদি অথবা ভুষি মালের দোকান কিংবা গ্যারেজে। জমজমাট আরিচার ঘাট পরিণত হয়েছে বড় বাজারে। স্থানীয় বাসিন্দা,গরুর ব্যাপারীরাই কোন রকমে বাঁিচয়ে রেখেছেন এগুলোকে। বেকার হয়ে ভিন্ন পেশায় চলে গেছে হকার ফেরীওয়ালা সহ ১০ হাজারেরও বেশী ঘাট নির্ভর মানুষ।
রমরমা বোর্ডিং ব্যবসা ঃ এখন শুধুই স্মৃতি
আরিচা ঘাটের সোনালী দিনে গড়ে উঠেছিল অসংখ্য আবাসিক বোডির্ং । দেশের উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চল থেকে আসা এবং যাবার পথে যাত্রীরা প্রয়োজন অনুযায়ী  রাত কাটাতো এসব বোডির্ংএ। বোর্ডিংগুলোর নিয়মিত এবং “বান্ধাকাস্টমার”বা বোর্ডার ছিল অপেক্ষমান বা যানজটে আটকেপরা বাস-ট্রাকের ড্রাইভার হেল্পাররা । জনপ্রিয় ও সুপরিচিত বোডির্ংগুলোর মধ্যে ছিল ঢাকা বোর্ডিং, মানিকগঞ্জ বোডির্ং, যমুনা বোর্ডিং,ভাইভাই বোর্ডিং,জাকারিয়া বোর্ডিং,ইসলামিয়া বোর্ডিং,জমদুয়ারা বোর্ডিং ,আরিচা রেস্টহাউস,পলাশ বোর্ডিং। সবচেয়ে বড় ছিল এশিয়া বোর্ডিং। কেউ কেউ মাস চুক্তিতে ভাড়া নিতেন বোডির্ং রুম। থাকতেন প্রয়োজন মত কখনো মাসের পর মাস । বাড়ির চিঠি-পত্রও আসতো বোর্ডিং এর ঠিকনায়। এমন একজন বোর্ডার ছিলেন ধামরাইয়ের ট্রাক ড্রাইভার নিয়ামত মুন্সি (৫৬)। ২২ বছর বয়সে ট্রাকের স্টিয়ারিং ধরেছিলাম,বিয়ে করেছি ৩০ এ। মাঝের বছরগুলোতে বাড়ি যেতাম কালেভদ্রে। আরিচার মীরপুর বোর্ডিংই ছিল এ সময়ে আমার স্থায়ী ঠিকানা। চকবাজার,বাদামতলী,গাবতলী Ñবেনাপোল ছিল নিয়মিত রুট। যানজট তার খারাপ লাগতো না,শুয়ে বসে স্ফুর্তি করে সময় কাটতো ভালই । বোডির্ং এর আনন্দ ছিল ভিন্ন মাত্রার বললেন আরেক ট্রাক চালক সাদেকুর রহমান(৪২),বললেন বোডির্ংএ মদ, মেয়েমানুষ সবই মিলতো হাত বাড়ালেই। থানা পুলিশ কাউকেই  ঘাটাবার সাহস পেতনা। ঘাটালেই শ’শ ড্রাইভার হেলপার শ্রমিকের ঘাটবন্ধের এক  ধমকেই পুলিশ সোজা হয়ে যেত। মানিকগঞ্জের তিল্লির ট্রাক ড্রাইভার সোলায়মানকে (৪১) আরিচার বোর্ডিং টানতো এক  ভিন্ন নেশায়,সে নেশা জুয়ার নেশা। সবই মনে আছে তার “৮/১০ বছরে গাড়ি চালিয়ে যা কামিয়েছি সবই গেছে বোডির্ং এর তিন-তাসের আসরে।” প্রথম প্রথম অস্থির লাগলেও ঘাটের বোর্ডিং বন্ধ হওয়াতে এখন সে খুশি। “নেশা এখন আর অগের মত নেই,খেলি তবে আরিচার মত সুখ পাইনা।”এমনি হাজার স্মৃতির হাজার রঙের বোর্ডিংগুলো সবই আজ বন্ধ। কোনটার সাইনবোর্ড নেমে গেছে কবে কেউ খোঁজ রাখেনি ,কোনটার সাইনবোর্ড রঙচটে সাদা হয়ে গেছে। কোনকোন সাইনবোর্ড এখনো নামানোই হয়নি হয় আলস্যে অথবা মায়ার টানে। ঢাকা বোর্ডিং এখন পরিনত হয়েছে গ্যারেজে,পাবনা হোটেল হয়েছে ফলের আরত,মোল্লা হোটেল এন্ড রেস্ট হাউজ পরিণত হয়েছে বসত বাড়িতে। দিদার আবাসিক হোটেল এবং চৌধুরী বোর্ডিং এর উপরতলা বন্ধ থাকলেও নীচতলায় চলছে গ্যারেজ। পরিত্যক্ত অবস্থায় আছে মাদারীপুর বোডির্ং। বিখ্যাত নিরিবিলির নীচে জমেছে ভাঙ্গারী ব্যবসা। বন্ধ হয়ে আছে সবচেয়ে বিলাসবহুল এশিয়া বোর্ডিং সহ অসংখ্য  বোর্ডিং যার সঠিক হিসাবও আজ কারো মনে নেই ।
ফেরী টার্মিনাল ঃ এখন গরুর বাথান !
থানা মোড় থেকে উত্তর-পশ্চিমে বি.আই.ডবিব্লিউ.টি.এ’র বিশাল টার্মিনাল। ৯’শ থেকে ১হাজারের মত ট্রাক একসাথে অপেক্ষা করতে পারতো এখানে। সেই টার্মিনাল এখন শূণ্য। ট্রাকতো দূরের কথা একটি টেম্পুও নেই। বি.আই.ডব্লিউ.টি.এ’র বিশাল টার্মিনাল এখন কার্যতঃ গরুর বাথান। দেশের উত্তর এবং দক্ষিণ অঞ্চল থেকে ট্রলার বোঝাই গরুর দল এসে নামে এই ঘাটে। এরপর ২৫/৩০ টি ট্রান্সপোর্টের শতাধিক ট্রাক এই গরুগুলোকে বয়ে নিয়ে যায় রাজধানী ঢাকাসহ অন্যান্য গন্তব্যে। হাতে গোনা মাত্র কটি বছরের ব্যবধানে ইতিহাস হয়েছে দেশজুড়ে অলোচিত-সমালোচিত আরিচা ঘাট ।

ভিআইপির ঢল ,পদ্মার ইলিশ,পাঙ্গাশ ঃ
যমুনা সেতু আর মাওয়া ফেরী ঘাট চালু হবার আগ পর্যন্ত রাজধানী থেকে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের ৩৬ এবং উত্তরাঞ্চলের ১৬ টি জেলার সড়ক পথে যেতে এবং আসতে আরিচার মাটি না মাড়িয়ে উপায় ছিল না। ফলে আরিচা ফেরী ঘাট  কবে যে ভিআইপি বিহীন ছিল বলতে গেলে রীতিমত গবেষণা করতে হবে। প্রায়শই থাকতো ভিআইপির ভির, কেউ কেউ বলতো ভিআইপির ঢল । মন্ত্রী-সচিব,বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের বড়নেতা,মাঝারী নেতা থেকে শুরু করে বিভিন্ন দপ্তর পরিদপ্তরের প্রধানরা দাপ্তরিক এবং ব্যক্তিগত  প্রয়োজনে ছুটেছেন আরিচা হয়ে । তবে এই যাওয়া আসার দিনক্ষণ জানিয়ে  আগাম বার্তা দিতে ভুলতেন না কেউই । এই আগাম বার্তার মজেজা বুঝতে ডিসি থেকে ওসি  কেউই ভুল করতেন না। প্রথমতঃ সময় মত ফেরীর সিরিয়াল নিশ্চিত করা,দ্বিতীয়ত ঃ যাওয়া-আসার পথে বিরতিকালীন সেবা। অধিকাংশ ভিআইপি এই সেবার নমুনা হিসাবে খুশিমনে বাড়িতে বয়ে নিয়ে যেতেন আরিচার দেশখ্যাত পাঙ্গাশ,আর পদ্মার তরতাজা ইলিশ। এই পাঙ্গাশ আর ইলিশে তুষ্ট করে চতুর অধস্তন অনেকেই বাগিয়ে নিয়েছেন বড় ব্যবসা,ভাল ভাল পোস্টিং, প্রোমোশন। এরশাদ জামানার মাঝামাঝিতে প্রভু ভিআইপির মন বুঝতে না পেরে  শিবালয় উপজেলার এক ইউএনওকে শিবালয়ে যোগদানের ১৫ দিনের মাথায় বাক্সপেটরা গুটিয়ে চলে যেতে হয়েছিল। বেচারা  ইউএনও কারন খুঁজে হয়রান হয়ে শেষ পর্যন্ত জানতে পেরেছিলেন  তার আমলা বস যতবার ঘাট পেড়িয়ে রাজধানীতে ফিরেছেন ততবারই তার গাড়িতে উঠেছে ১২/১৪ কেজি সাইজের পাঙ্গাশ। সেবারই নাকি এর ব্যতিক্রম ঘটেছিল। আরিচার পাঙাশ আর ইলিশে তুষ্ট করে অনেকেই কাটিয়েছেন পছন্দের জায়গায় বছরের পর বছর।
শিবালয় থানার আরিচা ঃ ওসির  পোস্টিং হত নিলামে
পুলিশের গোপন খাতায় দেশের ১০ টি সেরা থানার একটি হিসাবে খ্যাতি ছিল শিবালয়ের। এই খ্যাতির জন্য আর কিছুনা শুধু আরিচা ঘাটই ছিল যথেষ্ট। এই থানার ওসি’র পোস্টিং নাকি নিলামে উঠতো। মোটা টাকায় পোস্টিং নেয়া দারোগারা নির্দিষ্ট মেয়াদ পর্যন্ত থাকতো বেপরোয়া। বছর চুক্তি লীজের মত। চোখ কান খোলা  যে কোন ওসির সারাজীবনের কামাইয়ের জন্য এই থানায় ২ বছরের চাকরিই ছিল বাড়ন্ত। কমপক্ষে ২২টি খাত থেকে আসতো নিয়মিত মোটা মাসোহারা। বাড়তি দাও হিসাবে থাকতো স্বণর্, হেরোইন,ঈদের মওসুমে ভারতীয় দামী শাড়ির একটি দুটি চালান সাহস করে গিলে ফেলা। শুধু ওসি নয় দারোগা থেকে কনস্টেবল সবাই অল্পদিনেই মালামাল হয়ে যেতেন। আরিচা ঘাটের পয়সা নাকি গড়াতো এসপি থেকে আইজি পর্যন্ত ।
চোরাই তেলের বাণিজ্য,চোরাচালান ও মাদক ব্যবসার পপুলার রুট ঃ
আরিচা ঘাটের খ্যাতি-অখ্যাতি ছিল বহুমাত্রিক। এর একটি অংশ জুড়ে ছিল চোরাই তেলের বাণিজ্য। ২০-২৫ টি ফেরীর দিন রাত চলাচলের জন্য বরাদ্দ ছিল মোটা মাপের জ্বালানী তেল। এই তেলের বরাদ্দ লাফিয়ে বাড়ানোর তত্ত্ব ছিল রেডিমেট, এ এক রহস্যঘেরা গোলকধাঁধাঁ । ভরা বর্ষা, নৌপথ লম্বা হয়ে গেছে,তেলের পরিমান বাড়াও। শুকনো মওসুম পানি কম,তাতে কি  ফেরী চ্যানেল আঁকাবাঁকা ঘুর পথের হয়ে গেছে,লাগাও তেল। নদীর স্রোত আগের চেয়ে অনেক তীব্র, স্রোত ঠেলে উজান বইতে হচ্ছে, তেল লাগছে দ্বিগুণ,বাড়াও তেল। নানা ফঁন্দি ফিঁকিরে মনমত বাড়তো তেলের পরিমান। চাইতেই যতটুকু দেরী,বাড়তি বরাদ্দ দেয়ার জন্য এ পায়ে দাঁড়িয়ে থাকতেন বড় কর্তারা। হরিলুটের কার্যকর উপমা। আরিচা ফেরী ঘাটের সীমাহীন গুরুত্বের দিনে তেল কত গেল তা নিয়ে ভাববার সময় ছিলনা কারো। একদিনে মোট বরাদ্দের ২৫ ভাগ জ্বালানী তেলই থাকতো লুটের জন্য। এই ২৫% তেল বিক্রি হত চোরাই মার্কেটে। এই তেল বেচা টাকার ভাগ যেতো ফেরী মাস্টার থেকে শুরু করে বিআইডব্লিউটিসি’র  শীর্ষ কর্তাদের পকেটে। শুধু ফেরী নয় বি.আই.ডবিব্লিউ.টি.এ’র ড্রেজিং খাতে চলেছে পুকুরচুরি। ড্রেজিং খাতে তেল ব্যবহারের  ভূয়া হিসাব কে পুকুরচুরি কললেও কম বলা হত।  কেউ কেউ রসিকতা করে বলেন গত দুই যুগে ড্রেজিং খাতে যে পরিমান তেল চুরি হয়েছে সেই টাকায় আরিচায় পদ্মাসেতু হত দুটি। এই হিসাব একেবারে ফেলে দেয়ার মত নয় । ফেরী ও ড্রেজিং এর চোরাই তেল কেনার জন্য আরিচায় গড়ে উঠেছিল একাধিক সিন্ডিকেট । চোরাই তেলের ব্যবসায় ঘাটে কুলিগিরি দিয়ে জীবন শুরু করা এক সুপরিচিত ব্যক্তি বনে গেছেন শতকোটি টাকার মালিক।   তারই মত ভাগ্য ফিরেছে কপর্দকহীন আরও ডজন খানেক মানুষের। এদের অনেকেই এখনো আরিচা এলাকার  ভাগ্যবিধাতা। শুধু চোরাই তেলের বাণিজ্যই নয় এক সময় আারিচা ঘাট ছিল মাদক আর চোরাচালানের নিরাপদ রুট। ভারত থেকে দেশের উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চল হয়ে আসা আমদানী নিষিদ্ধ চোরাইপণ্য ও মাদকদ্রব্য আরিচা ঘাট হয়েই রাজধানী ঢাকায় ঢুকতো । সড়কপথে এর বিকল্পও ছিল না। কার্যত এটি ছিল নিরাপদতম রুট। দারুচিনি থেকে শুরু করে শাড়ি-চিনি,গরু সবই আসতো এ পথেই । সাথে আসতো ফেন্সিডিল হেরোইন সহ নানা মাদক দ্রব্য। চোরা চালানের এসব পণ্য নিরাপদে ঢাকায় পৌঁছে দেয়ার জন্য আরিচা,নগরবাড়ি ,গোয়ালন্দ/দৌলতদিয়া ঘাটে সক্রিয় ছিল শক্তিশালী ৫/৬ টি চক্র । এরা তিনটি ঘাট এবং ঘাট সংশ্লিষ্ট থানা থেকে শুরু করে রাজধানী ঢাকা পর্যন্ত পুলিশ-মাস্তান সব কিছুকেই নিয়ন্ত্রন করতো। এই চক্রকে না জানিয়ে এই রুট দিয়ে একটি সূঁই পাচারও ছিল অসম্ভব ঘটনা । এদের কথার বাইরে অবৈধ পণ্য ধরার এবং ধরার পর তা আটকে রাখার সাহস কোন পুলিশের ছিলনা । চোরাই চালান আটকে এবং তা না ছেড়ে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বদলি হয়ে বান্দরবান গেছেন এমন ঘটনাও বিরল নয়। এই চক্্েরর হোতারা এর বিনিময়ে পেতেন লাখলাখ টাকার কমিশন । শুধু কমিশনই নয়  এদের  অনেকেই পরে নিজেরাই পরিনত হন বড় মাপের চোরাকারবারীতে । ম্বাধীনতার আগে ও পরে  লুঙ্গি-গেঞ্জি খালি পায়ে হাটা ডজন খানেক মানুষ আরিচা ঘাটের  চোরা গলিতে হেটে বনে গেছেন ধনকুবের । গাড়ি-বাড়ি বদল তাদের কাছে আজ নস্যিতুল্য কর্ম । যমুনা সেতু এবং মাওয়া ফেরী ঘাট এই চোরাই বাণিজ্যের সোনালী দিনেও আঁধার নামিয়ে এনেছে । সি-িকেট হোতারা  তাদের কালো টাকার পাহারে সাদা রঙ লাগিয়ে সাদা ব্যবসায় শুদ্ধ হয়েছেন । তবুও আরিচা ঘুড়লে এখনো ভেসে উঠে এসব কিংবদন্তী এবং এর নায়কদের নাম ।
হকার-ফেরীওয়ালা ঃ জীবনের ছন্দপতন ।
পূর্ণ যৌবনে আরিচা ঘাট নিশিদিন  গরম থাকতো হকার-কুলি-ফেরীওয়ালাদের হাকডাকে। ঘাটের বিভিন্ন সমিতির রেজিস্টার্ড কুলি-ফেরীওয়ালা ও হকারের সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৪৭২ জন । নন রেজিস্টার্ড হকার-কুলি-ফেরীওয়ালার সংখ্যা ছিল পাঁচ শয়ের মত । এসব  হকার-ফেরীওয়ালাদের অধিকাংশই এখন পার করছে নিরানন্দ দুঃসহ জীবন । এদের বেশীর ভাগই আরিচা ঘাট ও এর আশপাশের গ্রামের মানুষ । বাইরের জেলা ও এলাকা থেকে আসা হকারেরা চলে গেছে এদিক সেদিক ,নতুন গন্তব্যে নতুন কোন কর্মক্ষেত্রে । ঢাকা আরিচা মহাসড়কের পাশেই মহাদেবপুর বাজার। এই বাজার এলাকায় ভ্যান চালান জমির আলী ( ৪৭ )। আরিচা ঘাটে শশা-তরমুজ বেঁচতেন তিনি । টানা ১১ বছরের  শশা Ñ তরমুজের হকারী করেছেন। ৩ মেয়ে ১ ছেলের সংসারে অভাব ছিলনা। ঘাটের আয়েই তিন মেযেকে ভাল ঘরে বিয়ে দিয়েছেন। ছেলে ম্যাট্রিক পাশ করে ঢাকার একটি প্রেসে কাজ করছে। আরিচাকে প্রতিদিনই তার কাছে মনে হয়েছে মেলার মত। বানিয়াজুরীর রহমত আলী ( ৩৭) আরিচা ঘাটে পান সিগারেট  ফেরী করে বেঁচতেন । সকাল থেকে রাত বারটা/ একটা পর্যন্ত বাসস্ট্যা-,লঞ্চঘাট,ফেরীঘাট,ট্রাক টার্মিনাল কোন যায়গা বাদ যেতে না । দিনরাত ঘুড়ে বেড়াতে সামান্য ক্লান্তিও লাগতো না ,হাজারো মানুষের রকমারি ঘটনায় সময় গড়িয়ে যেত। এখন আর সেদিন নেই ,দিন চলে গ্রামের গৃহস্থ বাড়িতে কৃষি শ্রমিকের একঘেয়ে পরিশ্র্রম করে । জাফরগঞ্জের শাহাদৎ, পয়লার মোয়াজ্জেম,নালীর হাতেম আলী র মত ২০/২৫ জন আছেন যারা আরিচা ঘাটের ভরা যৌবন দেখেছেন । লঞ্চে- ফেরিতে ফেরী করে বেঁচেছেন  সেদ্ধডিম,সন্দেশ , চকলেট ,চানাচুর, বাদাম, করেছেন  কুলির কাজ । দিন শেষে   দুশো আড়াইশ  টাকা না নিয়ে ঘরে ফেরেননি । এখন এরা মানিকগঞ্জ শহরের নিয়মিত রিক্সা চালক।  নালীর নুজগর আলীর (৬৫) ছিল ফান্টা কোক,সেভেনআপ,কলা পাউরুটির ছোট্ট দোকান ঘর । দেদার বিক্রি ছিল,দুজন কর্মচারী দিনভর অবসর পেতনা। ঘাট মরে যাবার পর  সব শেষ। এখন পুরোপুরি বেকার। বেঁচে আছেন ছেলেদের দয়ায় উপর। এমনি ভাবে বেকারত্ম গ্রাস করেছে তেওতার সুবল(৬৫),দাশকান্দির সায়েদুর (৫৬) টেপড়ার নূরনবী ( ৫৮) র মত ছোট ছোট অসংখ্য দোকনীর জীবন।
আরিচা এখন ঃ শুধু দীর্ঘশ্বাস,শ্মশানের স্তব্ধতা
এপথে চলার স্মৃতি আছে এমন মানুষ এখন যদি মধ্যদুপুরে শিবালয় থানার সামনে দাঁড়িয়ে পশ্চিমে তাকান নির্ঘাৎ তিনি আঁতকে উঠবেন ,শান্ত-শব্দহীন চারপাশ। ঘাটের যৌবনকালে যেদিন সবচেয়ে কম গাড়ি থাকতো সেদিনও এই থানার সামনে দাঁিড়য়ে পাড়অন্ধও বুঝে ফেলতো ঘাট আর দূরে নেই । কিলবিলে বাস ট্রাক,হোটেল রেস্তাঁরার বয় বেয়ারা ,হকার-কুলির হাঁক ডাকে সদা সরগরম। সেই আরিচা পুরোপুরি নিথর,নি®প্রাণ। দু’চারটি বাস মিনিবাসের অলস ভঙ্গিতে জাবর কাটা । বিশাল রেন্ট্রি কড়ই গাছগুলো তেমনি আছে আছে তার ছায়া । শুধু নেই দূর-দূরান্তের রকমারি হাজারো মানুষের ব্যস্ত আনাগোনা। শিবালয় থানার সামনের কড়ই তলায় পানবিড়ির বাক্স নিয়ে বসতেন তেওতার হামেদ আলী (৫৮)। মধ্যজীবনে স্মৃতি হাতরে গভীর দীর্ঘশ্বাস নিয়ে তিনি বললেন – “বিশ্বাস করেন যেদিন বিক্রি কম হয়েছে সেদিনও বাড়ি নিয়েছি শ’ দেড়শ টাকা হাতে নিয়ে,কত মানুষ,কত গড়ি রাতদিন নাই।” এই হামেদ আলী এখন পুরোপুরি কৃষি শ্রমিক। যেদিন কাজ থাকেনা সেদিন ছুটে আসেন ঘাটে , চোখের সামনে বায়োস্কোপের মত ভাসে সব ।
এখন,এই সময়ে আরিচা ঘাট বিগত যৌবনা,শুনশান নিরবতায় নিমগ্ন এক জল-বালুর বেলাভূমি। এক বাক্যের এই উত্তরই আরিচাকে চিনতে যথেষ্ট। ইতিহাস হয়ে গেছে আরিচা ফেরীঘাটের  জীবন অতিষ্ঠ করা যানজট, খবরের কাগজের লাগাতার লীড নিউজের দিন,শ’শ হোটেল-রেস্টুরেণ্ট-বোর্ডিং রাতদিন ক্লান্ত-ব্যস্ত,বয়-বেয়ারা সবই ইতিহাস। ফেরীওয়ালা-কুলি,যাত্রী-হকারে গমগমে নদীপার,মধ্যরাত বিদীর্ণ করা ভেপুÑহর্ণ,সার্চলাইটের আলোর বন্যা, ধোঁয়াতোলা ইলিশ-ঝোল,পাঙ্গাশ-পেটিতে উদরপূর্তি আর কুকুরের মাংস বিতর্কে দেশজুড়ে আলোচিত -সমালোচিত আরিচা ফেরীঘাট আজ এক বিস্মৃত বেদনার মহাকাব্য। ঘাটজুড়ে কেবলই ভাসে দীর্ঘশ্বাস,গভীর রাতে যা শুধুই দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয় ।



>