ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানি বন্দরগুলোতে অবরোধ অব্যাহত রাখে, তাহলে হরমুজ প্রণালি আবারও বন্ধ করে দেওয়া হবে। শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এই হুঁশিয়ারি দেন।
গালিবাফ আরও বলেন, এই জলপথ দিয়ে জাহাজ চলাচল ইরানের অনুমোদনের ওপর নির্ভর করবে। তাঁর এই মন্তব্যের প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক তেলবাজারে। ব্রেন্ট ক্রুড ও ইউএস অয়েলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯০ ডলারের নিচে নেমে এসেছে। দিন শেষে ব্রেন্ট ক্রুড ৯ দশমিক ১ শতাংশ কমে ৯০ ডলার ৩৮ সেন্টে স্থির হয়।
উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। এরপর থেকে কৌশলগত এই সমুদ্রপথ দিয়ে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ অপরিশোধিত জ্বালানি তেল এই পথে পরিবহন করা হয়।
লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যে ১০ দিনের যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও দক্ষিণ লেবাননের বিভিন্ন এলাকায় বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে বলে দেশটির সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। সীমান্ত এলাকার যেসব শহর এখনো ইসরায়েলি সেনাদের নিয়ন্ত্রণে, সেখানে তারা ঘরবাড়ি ধ্বংস করছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
ইসরায়েলি কর্মকর্তারা প্রকাশ্যেই বলেছেন, তারা লেবাননের শহরগুলো ধ্বংস করতে দিতে চান, যাতে বাসিন্দারা আর সেখানে ফিরে যেতে না পারেন।
ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত এক ঘণ্টায় যে সাতটি দাবি করেছেন, সেগুলোর সবই মিথ্যা। এক্স পোস্টে তিনি বলেন, এই মিথ্যা দিয়ে তারা যুদ্ধেও জয়ী হয়নি এবং আলোচনাতেও কোনো অগ্রগতি করতে পারবে না।
গালিবাফ আরও বলেন, হরমুজ প্রণালির নিয়মকানুন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নির্ধারিত হতে পারে না।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছেন, হরমুজ প্রণালি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের বক্তব্য পরস্পরবিরোধী এবং এতে তাদের ‘হতাশা ও অসহায়ত্ব’ প্রকাশ পাচ্ছে। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের এক্স পোস্টের কারণে আমাদের প্রভাবিত হওয়া উচিত নয়। হরমুজ প্রণালি খোলা বা বন্ধ রাখার বিষয়টি বাস্তব পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নয়।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ খুলে দেওয়ার ঘোষণা দিলেও বাস্তবে সেখানে এখনো জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হয়নি বলে জানিয়েছেন কাতার বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবদুল্লাহ বান্দার আল-ইতাইবি। তিনি বলেন, অনিশ্চয়তার কারণে সামুদ্রিক পরিবহন ব্যবস্থা খুব দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরার সম্ভাবনা নেই। কাতার দুটি জাহাজ পাঠানোর চেষ্টা করেছিল, কিন্তু সেগুলো প্রণালি পার হতে দেওয়া হয়নি।
মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ লেবাননের কাসমিয়েহ সেতুতে ইসরায়েলের বোমা হামলার নিন্দা জানিয়েছে। যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর অনেক বাসিন্দা পায়ে হেঁটে ক্ষতিগ্রস্ত সেতু পার হয়েছেন। সংস্থাটি বলেছে, ইসরায়েলে অস্ত্র বিক্রি বন্ধের মাধ্যমে সরকারগুলোর উচিত স্পষ্ট বার্তা দেওয়া যে তারা যুদ্ধাপরাধে জড়িত হওয়ার ঝুঁকি নেবে না।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের সঙ্গে চুক্তি নিয়ে বড় ধরনের কোনো মতপার্থক্য নেই। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ইরান ও লেবাননকে ঘিরে আলোচনায় ‘অনেক ভালো অগ্রগতি’ হচ্ছে। ইরান ইঙ্গিত দিয়েছিল, চুক্তির বিষয়ে তাদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের এখনো বড় মতপার্থক্য রয়েছে। এ বিষয়ে ট্রাম্প বলেন, ‘দেখা যাক কী হয়। তবে আমার মনে হয় না বড় কোনো পার্থক্য রয়েছে।’
ইরান তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম যুক্তরাষ্ট্রে পাঠাতে রাজি হয়েছে বলে দাবি করেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তবে তাঁর এ দাবি সরাসরি নাকচ করেছে ইরান। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, ‘সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম আমাদের কাছে ইরানের মাটির মতোই পবিত্র। কোনো পরিস্থিতিতেই এটি কোথাও স্থানান্তর করা হবে না।’
ইরানের মিত্র ইরাকি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর কয়েকজন কমান্ডারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বলেন, ইরান সমর্থিত এসব গোষ্ঠীকে তারা মার্কিন নাগরিক বা যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের জন্য হুমকি তৈরি করতে দেবে না।
ইরান হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করার ঘোষণা দিলেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের বন্দরগুলো ঘিরে মার্কিন অবরোধ বজায় থাকবে। এর প্রতিক্রিয়ায় ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোর ওপর অবরোধ বজায় রাখলে পাল্টা ব্যবস্থা নেবে তেহরান।
লেবাননের প্রধানমন্ত্রী নাওয়াফ সালাম বলেছেন, রাজধানীসহ বৈরুতের পুরো প্রশাসনিক অঞ্চলের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেবে তার সরকার। এখন থেকে অস্ত্র শুধু রাষ্ট্রীয় বাহিনীর হাতেই থাকবে। তিনি জানান, নাগরিকদের নিরাপত্তা ও জানমাল রক্ষার লক্ষ্যেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে এবং এটি ‘অপরিবর্তনীয়’ ও ‘কঠোরভাবে বাস্তবায়ন’ করা হবে।
তবে সমালোচকেরা বলছেন, লেবাননের সশস্ত্র বাহিনী আগে থেকেই বৈরুত নিয়ন্ত্রণ করছে। হিজবুল্লাহর কোনো দৃশ্যমান সামরিক উপস্থিতি নেই। কেউ কেউ মনে করেন, এই ঘোষণা বৈরুতে ইসরায়েলের হামলার অজুহাত তৈরি করে দিতে পারে।

শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৮ এপ্রিল ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন