বর্তমান সরকারের মেয়াদ দুই মাস পূর্ণ হয়েছে শুক্রবার (১৭ এপ্রিল)। গত দুই মাসে রাষ্ট্র সংস্কার, জনকল্যাণ নিশ্চিতকরণ এবং প্রতিটি নাগরিকের অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার সরকারের নেওয়া ৬০টি বিশেষ পদক্ষেপের কথা জানিয়েছে সরকার।
শনিবার (১৮ এপ্রিল) গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে সরকারের এই উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার বিস্তারিত তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন।
বিবৃতিতে জানানো হয়, নির্বাচনের আগে দেওয়া ইশতেহার বাস্তবায়নে সরকার ইতিমধ্যে ১৮০ দিনের একটি অগ্রাধিকারমূলক কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। বিবৃতিতে প্রধানমন্ত্রীর ৬০টি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ তুলে ধরা হয়েছে।
নারীর ক্ষমতায়নে পাইলট প্রকল্পের আওতায় ইতিমধ্যে ৩৭ হাজার ৫৬৭ পরিবারকে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ প্রদান করা হয়েছে, যার মাধ্যমে প্রতি মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা নগদ সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। ১০টি জেলার ২২ হাজার কৃষককে ১০টি সুবিধা সংবলিত ‘কৃষক কার্ড’ প্রদান করা হয়েছে। প্রায় ১২ লাখ ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ সুদসহ মওকুফ করা হয়েছে।
সংসদীয় গণতন্ত্রের নজির স্থাপন করে প্রথম অধিবেশনে ১৩৩টি অধ্যাদেশ নিষ্পত্তি করা হয়েছে। এর মধ্যে গুম প্রতিরোধ ও মানবাধিকার রক্ষা বিষয়ক অধ্যাদেশসহ ১৬টি অধ্যাদেশ অধিকতর যাচাইয়ের পর বিল আকারে আসবে। ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নে প্রধানমন্ত্রী দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
৫৪টি জেলায় ২০ হাজার কিলোমিটার নদী-খাল খননের কাজ শুরু হয়েছে। বৈশ্বিক সংকট সত্ত্বেও ভর্তুকি বাড়িয়ে জ্বালানি তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়েছে। রুফটপ সোলারের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে ৩৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত হয়েছে; ২০৩০ সালের মধ্যে ১০ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। জ্বালানি সংগ্রহের জন্য ‘ফুয়েল কার্ড’ এর পাইলটিং শুরু হয়েছে।
৪ হাজার ৯০৮ জন ইমাম-মুয়াজ্জিন এবং অন্যান্য ধর্মের পুরোহিত ও যাজকদের মাসিক সম্মানী প্রদান শুরু হয়েছে। হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ও নৃ-গোষ্ঠী বিষয়ক প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
যাকাত ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং ঈদ উপলক্ষে অসহায়দের মাঝে ত্রাণ বিতরণ করা হয়েছে। প্রবাসীদের জন্য শিগগিরই ‘প্রবাসী কার্ড’ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। হজের খরচ টিকিটপ্রতি ১২ হাজার টাকা কমানো হয়েছে এবং ‘নুসুক হজ কার্ড’ চালু হয়েছে।
সরকারি অফিসের ৪ লাখ ৬৮ হাজার ২২০টি শূন্যপদ পূরণে ৫ বছর মেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। বন্ধ চিনিকল, রেশম ও পাটকল পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইকোনমিক জোন ও হাই-টেক পার্কগুলোতে স্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে ইকোসিস্টেম তৈরি করা হচ্ছে।
২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশে উন্নীত করার ৫ বছর মেয়াদি কৌশলগত কাঠামো প্রণয়ন করা হয়েছে। ১০০ কোটি টাকা পর্যন্ত বিদেশি বিনিয়োগ প্রত্যাবাসনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পূর্বানুমোদনের বাধ্যবাধকতা শিথিল করা হয়েছে। ঈদের আগে সব শ্রমিকের বেতন-বোনাস নিশ্চিত করা হয়েছে।
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় উন্মুক্ত করা হয়েছে এবং অভিবাসন ব্যয় হ্রাস করা হয়েছে। ইউরোপের ৭টিসহ মোট ৮টি দেশের সঙ্গে নতুন শ্রমবাজারের দ্বিপাক্ষিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। দেশজুড়ে টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টারে বহুমুখী দক্ষতা বৃদ্ধির কারিকুলাম চালু করা হয়েছে। উত্তরবঙ্গকে ‘অ্যাগ্রো প্রসেসিং হাব’ হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পে-পাল (PayPal) ও অন্যান্য পেমেন্ট গেটওয়ে বাংলাদেশে চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এক লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, যার ৮০ শতাংশই নারী। স্বাস্থ্যসেবায় ‘ই-হেলথ কার্ড’ ও হাসপাতালে বিশেষ নিরাপত্তারক্ষী মোতায়েন করা হয়েছে।
পুনঃভর্তি ফি বাতিল এবং সব স্তরের শিক্ষাবৃত্তির অর্থ দ্বিগুণ করা হয়েছে। উচ্চশিক্ষায় বিদেশ গমনে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত জামানতবিহীন ব্যাংক গ্যারান্টির ব্যবস্থা করা হয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ৯ হাজার ধর্মীয় শিক্ষক নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। চতুর্থ শ্রেণি থেকে খেলাধুলা বাধ্যতামূলক এবং উপজেলা পর্যায়ে ১৮ জন করে ক্রীড়া শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। প্রতিভা অন্বেষণে ‘নতুন কুঁড়ি’ প্রতিযোগিতা পুনরায় শুরু করা হয়েছে।
২ লাখ শিশুকে স্কুল ড্রেস ও জুতা প্রদান এবং ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ পাইলট প্রকল্প চালু করা হয়েছে। মাদ্রাসায় স্মার্ট ক্লাসরুম ও কারিগরি কোর্স অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ১০০ জন ক্রীড়াবিদকে স্পোর্টস অ্যালাউন্স প্রদান করা হয়েছে।
৫ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে এবং এ বছর ১ কোটি ৫০ লাখ চারা উৎপাদন করা হচ্ছে। খালের পাশে হাঁটার রাস্তা ও নেটিং ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রীয় ভবনের বদলে নিজ বাড়ি ব্যবহার করছেন এবং যাতায়াতের খরচ নিজ তহবিল থেকে বহন করছেন। প্রটোকল সীমিত করে ট্রাফিক ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা হয়েছে এবং সরকারি সফরে আড়ম্বর হ্রাস করা হয়েছে। জমি নামজারিতে অনলাইন আবেদন বাধ্যতামূলক ও ২৪/৭ হটলাইন চালু করা হয়েছে। মরুপ্রক্রিয়া রোধে ‘পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প’ গ্রহণ করা হয়েছে।
মন্ত্রী-এমপিদের শুল্কমুক্ত গাড়ি ও সরকারি প্লট না নেওয়ার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সরকারি-বেসরকারি খাতে পাটজাত পণ্য ব্যবহারে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে জাতীয় পরিচ্ছন্নতা অভিযান শুরু করা হয়েছে। হামের টিকাদান কর্মসূচি পুনরায় শুরু করা হয়েছে। চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা ও জনবান্ধব পুলিশ গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ঢাকায় ইলেকট্রিক বাস ও নারীদের জন্য ‘পিংক বাস’ সার্ভিস চালু করা হয়েছে।
নদী দখলদারদের ৫ বছর কারাদণ্ড বা ১৫ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রেখে আইন সংশোধন করা হয়েছে। সরকারি অফিসে বিদ্যুৎ ও এসি ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়ার ১১টি নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
এনটিআরসি-র মাধ্যমে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও অধ্যক্ষ নিয়োগে মেধাভিত্তিক পরীক্ষা চালু করা হয়েছে। ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিট স্থাপন করা হচ্ছে, যা ২০২৯ সালে চালু হবে। ফুটপাত ব্যবসায়ীদের পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অবাধ বাকস্বাধীনতা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল দ্রুত চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট ও সৈয়দপুর বিমানবন্দরে ফ্রি ইন্টারনেট চালু করা হয়েছে। চলন্ত ট্রেন ও হাজার হাজার মাদ্রাসা-কারিগরি প্রতিষ্ঠানে ফ্রি ওয়াই-ফাই চালু করা হয়েছে।
প্রবাসীদের কল্যাণ ও বাণিজ্য প্রসারে ‘অর্থনৈতিক কূটনীতি’র ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। সীমান্ত হত্যা বন্ধ ও পানি বণ্টনসহ প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাচারকৃত অর্থ ফেরাতে ১০টি দেশের সঙ্গে আইনি সহায়তা জোরদার করা হয়েছে। উপকূলীয় অঞ্চলে নদী ভাঙন রোধে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। মানবাধিকার রক্ষা ও বিরোধী রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের ওপর দমন-পীড়ন বন্ধের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
বিবৃতিতে মুখপাত্র মাহদী আমিন বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার জনগণের হারিয়ে যাওয়া আস্থা ও বিশ্বাস ফিরিয়ে এনেছে। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়নই আমাদের মূল লক্ষ্য। সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আমরা একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলব।’

শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৮ এপ্রিল ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন