গণবার্তা

বাংলার বাঘ শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের ৬৪তম প্রয়াণী দিবস আজ

বাংলার বাঘ শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের ৬৪তম প্রয়াণী দিবস আজ

বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অনন্য উচ্চতার নাম আবুল কাশেম ফজলুল হক। ‘শেরেবাংলা’ বা ‘বাংলার বাঘ’ উপাধিতে পরিচিত এই নেতা শুধু রাজনীতিবিদই ছিলেন না, বরং বাঙালি জনগণের অধিকার আদায়ের এক দৃঢ় কণ্ঠস্বর ছিলেন। তাঁর জীবনজুড়ে ছিল সংগ্রাম, নেতৃত্ব এবং জনকল্যাণে অবিচল নিষ্ঠা। ১৯৬২ সালের ২৭ এপ্রিল তিনি মৃত্যুবরণ করেন। আজ তাঁর ৬৪তম প্রয়াণী দিবসে জানাই গভীর শ্রদ্ধা।

১৮৭৩ সালের অক্টোবরে বরিশালের ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলার সাতুরিয়া গ্রামে জন্ম নেওয়া ফজলুল হক শৈশব থেকেই মেধার স্বাক্ষর রাখেন। প্রাথমিক শিক্ষায় আরবি, ফার্সি ও বাংলায় পারদর্শিতা অর্জনের পর তিনি বরিশাল জিলা স্কুল থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন। প্রেসিডেন্সি কলেজ ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের পর কলকাতা হাইকোর্টে আইন পেশায় প্রবেশ করেন। পরে সরকারি চাকরিতে যোগ দিলেও মতবিরোধের কারণে তা ছেড়ে আবার আইন পেশায় ফিরে আসেন। তাঁর প্রকৃত পরিচয় গড়ে ওঠে রাজনীতিতে, যেখানে তিনি সাধারণ মানুষের প্রতিনিধি হয়ে ওঠেন।

বিংশ শতাব্দীর শুরুতে তাঁর রাজনৈতিক উত্থান ঘটে। তিনি নিখিল ভারত মুসলিম লীগ ও ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস উভয় দলেই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। ১৯১৬ সালের ঐতিহাসিক লক্ষ্ণৌ চুক্তি প্রণয়নে তাঁর ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। কৃষক ও সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ে তিনি ১৯২৭ সালে গঠন করেন কৃষক প্রজা পার্টি। ১৯৩৫ সালে তিনি কলকাতা মিউনিসিপ্যাল করপোরেশনের প্রথম মুসলিম মেয়র নির্বাচিত হন। ১৯৩৭ সালের নির্বাচনে জয়লাভের পর তিনি অবিভক্ত বাংলার প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে কৃষকবান্ধব নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে তিনি ‘বিনা ক্ষতিপূরণে জমিদারি প্রথা উচ্ছেদ’, ‘চাষী খাতক আইন’, ‘দোকান কর্মচারী আইন’ ও ‘পাট অধ্যাদেশ’ জারি করেন এবং ঢাকা, রাজশাহী ও খুলনায় কৃষি ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করেন।

১৯৪০ সালে লাহোরে অনুষ্ঠিত মুসলিম লীগের অধিবেশনে তিনি ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাব বা পাকিস্তান প্রস্তাব উত্থাপন করেন, যা উপমহাদেশের রাজনৈতিক গতিপথ বদলে দেয়। দেশভাগের পর তিনি ঢাকায় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যান। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে সমর্থন দেন। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের নেতৃত্ব দিয়ে পূর্ব বাংলার নির্বাচনে জয়লাভ করে মুখ্যমন্ত্রী হন। যুক্তফ্রন্ট সরকারের ২১ দফার মধ্যে তিনি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার সুপারিশ, একুশে ফেব্রুয়ারিকে শহীদ দিবস ঘোষণা, পহেলা বৈশাখকে ছুটির দিন করা এবং বর্ধমান হাউসকে বাংলা একাডেমিতে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত নেন। পরবর্তীতে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

শিল্প সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকতা ও সক্রিয় সম্পৃক্ততাও ছিল তাঁর জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তিনি ‘বালক’ ও ‘ভারত সুহৃদ’ পত্রিকা প্রকাশ করেন। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম সম্পাদিত ‘নবযুগ’ পত্রিকা প্রকাশে তিনি আর্থিক ও নৈতিক সহায়তা দেন। ব্রিটিশ সরকার যখন নবযুগ বন্ধ করে দিতে চায়, তখন তিনি নজরুলকে আরও গরম লেখার নির্দেশ দেন। তাঁর রচিত গ্রন্থের নাম ‘বেঙ্গল টুডে’।

১৯৬২ সালের ২৭ এপ্রিল সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ঢাকায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। জানাজা শেষে তাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় সমাহিত করা হয়, যেখানে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও খাজা নাজিমুদ্দিনের কবর রয়েছে। এই তিন নেতার সমাধিস্থল ‘তিন নেতার মাজার’ নামে পরিচিত।

শেরেবাংলা ফজলুল হকের অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ পাকিস্তান সরকার তাকে ‘হেলাল-ই-পাকিস্তান’ খেতাবে ভূষিত করে। বাংলাদেশে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, শেরেবাংলা ক্রিকেট স্টেডিয়াম, শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ ও শেরেবাংলা প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়সহ একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও জনগুরুত্বপূর্ণ ভবনের নামকরণ তাঁর নামে করা হয়েছে। বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট ও কুয়েটসহ দেশের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ আবাসিক হল তাঁর নামে নামকরণ করা হয়েছে। ঢাকার জাতীয় সংসদ ভবন যে এলাকায় অবস্থিত, তার নাম শেরেবাংলা নগর। বাঙালির অধিকার, কৃষকের স্বার্থ এবং গণমানুষের রাজনীতির যে দৃষ্টান্ত তিনি রেখে গেছেন, তা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। শেরেবাংলা ফজলুল হকের জীবন ও আদর্শ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক উজ্জ্বল অধ্যায় হয়ে রয়েছে।

আপনার মতামত লিখুন

গণবার্তা

সোমবার, ২৭ এপ্রিল ২০২৬


বাংলার বাঘ শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের ৬৪তম প্রয়াণী দিবস আজ

প্রকাশের তারিখ : ২৭ এপ্রিল ২০২৬

featured Image
বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অনন্য উচ্চতার নাম আবুল কাশেম ফজলুল হক। ‘শেরেবাংলা’ বা ‘বাংলার বাঘ’ উপাধিতে পরিচিত এই নেতা শুধু রাজনীতিবিদই ছিলেন না, বরং বাঙালি জনগণের অধিকার আদায়ের এক দৃঢ় কণ্ঠস্বর ছিলেন। তাঁর জীবনজুড়ে ছিল সংগ্রাম, নেতৃত্ব এবং জনকল্যাণে অবিচল নিষ্ঠা। ১৯৬২ সালের ২৭ এপ্রিল তিনি মৃত্যুবরণ করেন। আজ তাঁর ৬৪তম প্রয়াণী দিবসে জানাই গভীর শ্রদ্ধা।১৮৭৩ সালের অক্টোবরে বরিশালের ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলার সাতুরিয়া গ্রামে জন্ম নেওয়া ফজলুল হক শৈশব থেকেই মেধার স্বাক্ষর রাখেন। প্রাথমিক শিক্ষায় আরবি, ফার্সি ও বাংলায় পারদর্শিতা অর্জনের পর তিনি বরিশাল জিলা স্কুল থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন। প্রেসিডেন্সি কলেজ ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের পর কলকাতা হাইকোর্টে আইন পেশায় প্রবেশ করেন। পরে সরকারি চাকরিতে যোগ দিলেও মতবিরোধের কারণে তা ছেড়ে আবার আইন পেশায় ফিরে আসেন। তাঁর প্রকৃত পরিচয় গড়ে ওঠে রাজনীতিতে, যেখানে তিনি সাধারণ মানুষের প্রতিনিধি হয়ে ওঠেন।বিংশ শতাব্দীর শুরুতে তাঁর রাজনৈতিক উত্থান ঘটে। তিনি নিখিল ভারত মুসলিম লীগ ও ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস উভয় দলেই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। ১৯১৬ সালের ঐতিহাসিক লক্ষ্ণৌ চুক্তি প্রণয়নে তাঁর ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। কৃষক ও সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ে তিনি ১৯২৭ সালে গঠন করেন কৃষক প্রজা পার্টি। ১৯৩৫ সালে তিনি কলকাতা মিউনিসিপ্যাল করপোরেশনের প্রথম মুসলিম মেয়র নির্বাচিত হন। ১৯৩৭ সালের নির্বাচনে জয়লাভের পর তিনি অবিভক্ত বাংলার প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে কৃষকবান্ধব নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে তিনি ‘বিনা ক্ষতিপূরণে জমিদারি প্রথা উচ্ছেদ’, ‘চাষী খাতক আইন’, ‘দোকান কর্মচারী আইন’ ও ‘পাট অধ্যাদেশ’ জারি করেন এবং ঢাকা, রাজশাহী ও খুলনায় কৃষি ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করেন।১৯৪০ সালে লাহোরে অনুষ্ঠিত মুসলিম লীগের অধিবেশনে তিনি ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাব বা পাকিস্তান প্রস্তাব উত্থাপন করেন, যা উপমহাদেশের রাজনৈতিক গতিপথ বদলে দেয়। দেশভাগের পর তিনি ঢাকায় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যান। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে সমর্থন দেন। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের নেতৃত্ব দিয়ে পূর্ব বাংলার নির্বাচনে জয়লাভ করে মুখ্যমন্ত্রী হন। যুক্তফ্রন্ট সরকারের ২১ দফার মধ্যে তিনি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার সুপারিশ, একুশে ফেব্রুয়ারিকে শহীদ দিবস ঘোষণা, পহেলা বৈশাখকে ছুটির দিন করা এবং বর্ধমান হাউসকে বাংলা একাডেমিতে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত নেন। পরবর্তীতে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।শিল্প সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকতা ও সক্রিয় সম্পৃক্ততাও ছিল তাঁর জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তিনি ‘বালক’ ও ‘ভারত সুহৃদ’ পত্রিকা প্রকাশ করেন। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম সম্পাদিত ‘নবযুগ’ পত্রিকা প্রকাশে তিনি আর্থিক ও নৈতিক সহায়তা দেন। ব্রিটিশ সরকার যখন নবযুগ বন্ধ করে দিতে চায়, তখন তিনি নজরুলকে আরও গরম লেখার নির্দেশ দেন। তাঁর রচিত গ্রন্থের নাম ‘বেঙ্গল টুডে’।১৯৬২ সালের ২৭ এপ্রিল সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ঢাকায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। জানাজা শেষে তাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় সমাহিত করা হয়, যেখানে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও খাজা নাজিমুদ্দিনের কবর রয়েছে। এই তিন নেতার সমাধিস্থল ‘তিন নেতার মাজার’ নামে পরিচিত।শেরেবাংলা ফজলুল হকের অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ পাকিস্তান সরকার তাকে ‘হেলাল-ই-পাকিস্তান’ খেতাবে ভূষিত করে। বাংলাদেশে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, শেরেবাংলা ক্রিকেট স্টেডিয়াম, শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ ও শেরেবাংলা প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়সহ একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও জনগুরুত্বপূর্ণ ভবনের নামকরণ তাঁর নামে করা হয়েছে। বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট ও কুয়েটসহ দেশের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ আবাসিক হল তাঁর নামে নামকরণ করা হয়েছে। ঢাকার জাতীয় সংসদ ভবন যে এলাকায় অবস্থিত, তার নাম শেরেবাংলা নগর। বাঙালির অধিকার, কৃষকের স্বার্থ এবং গণমানুষের রাজনীতির যে দৃষ্টান্ত তিনি রেখে গেছেন, তা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। শেরেবাংলা ফজলুল হকের জীবন ও আদর্শ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক উজ্জ্বল অধ্যায় হয়ে রয়েছে।

গণবার্তা

সম্পাদকঃ নূর মোহাম্মদ
কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্ব সংরক্ষিত গণবার্তা