ঢাকা    শুক্রবার, ১২ জুন ২০২৬
ঢাকা    শুক্রবার, ১২ জুন ২০২৬
গণবার্তা

নয়াদিল্লিতে যৌথ সংবাদ সম্মেলন ছাড়াই শেষ হলো বিএসএফ-বিজিবি বৈঠক

নয়াদিল্লিতে যৌথ সংবাদ সম্মেলন ছাড়াই শেষ হলো বিএসএফ-বিজিবি বৈঠক

নয়াদিল্লিতে যৌথ সংবাদ সম্মেলন ছাড়াই শেষ হলো বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ে চার দিনের বৈঠক। সেখানে সীমান্তের সাম্প্রতিক উত্তেজনাসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে ভারতীয় সংবাদ সংস্থা পিটিআই জানিয়েছে।

দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের ইতিহাসে এই প্রথম এমন ঘটনা ঘটল। গত সোমবার বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবির প্রধান মেজর জেনারেল মহম্মদ আশরাফুজ্জামানের নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধি দল নয়াদিল্লিতে পৌঁছে বিএসএফের ডিজি প্রবীণ কুমারসহ অন্যান্য কর্তাদের সঙ্গে প্রাথমিক আলোচনা করেন। মঙ্গলবার দিল্লির লোদী রোডে বিএসএফের সদর দফতরে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছিল ভারত-বাংলাদেশ ৫৭তম সীমান্ত শীর্ষবৈঠক।

যৌথ বিবৃতি থাকছে, সংবাদ সম্মেলন নেই

কিন্তু নজিরবিহীন ভাবে শীর্ষবৈঠক শেষে যৌথ আলোচনার নথিতে স্বাক্ষরের পর দুই বাহিনীর ডিজি প্রথা মেনে যৌথ সাংবাদিক সম্মেলন করেননি। শুধু কী কী বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে সে সম্পর্কে একটি প্রেস বিবৃতি দেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে। কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা না দিয়েই সাংবাদিক সম্মেলন বাতিল করা হয়।

বিশ্লেষকরা বলছেন, সীমান্ত হত্যা ও পুশইনের মতো সংবেদনশীল বিষয়ে দুই পক্ষের মধ্যে ঐক্যমত্য না হওয়ার কারণেই হয়তো প্রচলিত এই রীতি ভাঙতে হয়েছে।

সীমান্ত উত্তেজনা ও পুশইন ইস্যু

চলতি বছরের গোড়ার দিকে বাংলাদেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর ঢাকায় বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর এবং পশ্চিমবঙ্গে নতুন বিজেপি সরকার নির্বাচিত হওয়ার পর এটিই ছিল দুই প্রতিবেশী দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর প্রথম বৈঠক।

বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ গত রোববার ঢাকায় সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন যে বিএসএফের ‘পুশইন’ এবং সীমান্তে গুলি চালানোর ঘটনাগুলো তারা বৈঠকে উত্থাপন করবেন। বাংলাদেশি প্রতিনিধি দল সীমান্তে প্রাণহানি ও ভারতীয় বাহিনীর আগ্রাসী আচরণের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে বলে সূত্র জানায়।

অন্যদিকে, ভারতীয় পক্ষ সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশি নাগরিকদের অনুপ্রবেশ (তাদের ভাষায়) বন্ধে কঠোর হওয়ার বার্তা দিয়েছে বলে জানা গেছে।

পশ্চিমবঙ্গের ভূমিকা

ভারত-বাংলাদেশের মোট ৪,০৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ আন্তর্জাতিক সীমান্তের অর্ধেকেরও বেশি (২,২১৬ কিলোমিটার) পশ্চিমবঙ্গে অবস্থিত। সীমান্তের প্রায় ৮৬০ কিলোমিটার অংশ এখনও কাঁটাতারের বেড়াবিহীন রয়েছে, যার মধ্যে ১৭৪.৫১ কিলোমিটার এমন এলাকা রয়েছে যেখানে বেড়া নির্মাণ সম্ভব নয়।

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সরকার ইতিমধ্যেই ঘোষণা করেছে যে তারা অবৈধ বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেবে। তাদের ভাষায়—অনুপ্রবেশকারী ব্যক্তিদের ‘ডিটেক্ট, ডিলিট অ্যান্ড ডিপোর্ট’ বা শনাক্ত, তালিকা থেকে বাদ এবং বহিষ্কারের পর্যায়ক্রমিক থ্রিডি অ্যাকশনের মুখোমুখি হতে হবে।

এই বক্তব্য নিয়ে বাংলাদেশে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, “আমাদের কোনো নাগরিক অবৈধভাবে সীমান্ত পার হচ্ছে—এমন কোনো প্রমাণ এখনো তারা পায়নি। পুশইনের চেষ্টা ও গুলি চালানো বন্ধ করাই দুই দেশের স্বার্থে।”

আলোচনার ইতিহাস

প্রসঙ্গত, দুই দেশের মধ্যে ডিজি-স্তরের সীমান্ত বৈঠক ১৯৭৫ থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর অনুষ্ঠিত হতো। তবে ১৯৯৩ সালে এটিকে বছরে দু’বার আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। যেখানে উভয়পক্ষ পর্যায়ক্রমে নয়াদিল্লি ও ঢাকায় বৈঠকে অংশ নেয়।

বিএসএফ-বিজিবি সর্বশেষ বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০২৫ সালের আগস্টে ঢাকায়। তখন বাংলাদেশে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতায় ছিল।

সাংবাদিক সম্মেলন না হওয়ার তাৎপর্য

এবারের বৈঠকে যৌথ সংবাদ সম্মেলন না হওয়াকে অনেকে ‘কূটনৈতিক শীতলতা’ হিসেবে দেখছেন। সূত্র জানিয়েছে, ‘পুশইন’ ও সীমান্ত হত্যার ঘটনায় বাংলাদেশের তীব্র অবস্থানের কারণে ভারতীয় পক্ষ চাপ অনুভব করেছে। পশ্চিমবঙ্গের নতুন সরকারের কঠোর বক্তব্যও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে নতুন টানাপড়েন সৃষ্টি করেছে।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম সূত্রে আরও জানা গেছে, উভয়পক্ষ সীমান্ত অপরাধ, চোরাচালান, মাদক পাচার ও মানবপাচারসহ বেশ কয়েকটি বিষয়ে আলোচনা করেছে। তবে ‘যৌথ বিবৃতিতে’ কী থাকছে, সেদিকে তাকিয়ে রয়েছে উভয় দেশের কূটনীতিক মহল।

এখন পর্যন্ত ভারতীয় বিএসএফ বা বাংলাদেশের বিজিবি কেউই আনুষ্ঠানিক কোনো প্রেস বিবৃতি দেয়নি। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে যৌথ বিবৃতি প্রকাশিত হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। সেখানে কোনো সমঝোতা হয়েছে কিনা, নাকি আলোচনা অনিশ্চিত অবস্থায় শেষ হয়েছে—তা পরিষ্কার হবে।

বিষয় : বিজিবি বিএসএফ

আপনার মতামত লিখুন

গণবার্তা

শুক্রবার, ১২ জুন ২০২৬


নয়াদিল্লিতে যৌথ সংবাদ সম্মেলন ছাড়াই শেষ হলো বিএসএফ-বিজিবি বৈঠক

প্রকাশের তারিখ : ১২ জুন ২০২৬

featured Image
নয়াদিল্লিতে যৌথ সংবাদ সম্মেলন ছাড়াই শেষ হলো বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ে চার দিনের বৈঠক। সেখানে সীমান্তের সাম্প্রতিক উত্তেজনাসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে ভারতীয় সংবাদ সংস্থা পিটিআই জানিয়েছে।দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের ইতিহাসে এই প্রথম এমন ঘটনা ঘটল। গত সোমবার বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবির প্রধান মেজর জেনারেল মহম্মদ আশরাফুজ্জামানের নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধি দল নয়াদিল্লিতে পৌঁছে বিএসএফের ডিজি প্রবীণ কুমারসহ অন্যান্য কর্তাদের সঙ্গে প্রাথমিক আলোচনা করেন। মঙ্গলবার দিল্লির লোদী রোডে বিএসএফের সদর দফতরে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছিল ভারত-বাংলাদেশ ৫৭তম সীমান্ত শীর্ষবৈঠক।যৌথ বিবৃতি থাকছে, সংবাদ সম্মেলন নেইকিন্তু নজিরবিহীন ভাবে শীর্ষবৈঠক শেষে যৌথ আলোচনার নথিতে স্বাক্ষরের পর দুই বাহিনীর ডিজি প্রথা মেনে যৌথ সাংবাদিক সম্মেলন করেননি। শুধু কী কী বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে সে সম্পর্কে একটি প্রেস বিবৃতি দেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে। কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা না দিয়েই সাংবাদিক সম্মেলন বাতিল করা হয়।বিশ্লেষকরা বলছেন, সীমান্ত হত্যা ও পুশইনের মতো সংবেদনশীল বিষয়ে দুই পক্ষের মধ্যে ঐক্যমত্য না হওয়ার কারণেই হয়তো প্রচলিত এই রীতি ভাঙতে হয়েছে।সীমান্ত উত্তেজনা ও পুশইন ইস্যুচলতি বছরের গোড়ার দিকে বাংলাদেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর ঢাকায় বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর এবং পশ্চিমবঙ্গে নতুন বিজেপি সরকার নির্বাচিত হওয়ার পর এটিই ছিল দুই প্রতিবেশী দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর প্রথম বৈঠক।বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ গত রোববার ঢাকায় সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন যে বিএসএফের ‘পুশইন’ এবং সীমান্তে গুলি চালানোর ঘটনাগুলো তারা বৈঠকে উত্থাপন করবেন। বাংলাদেশি প্রতিনিধি দল সীমান্তে প্রাণহানি ও ভারতীয় বাহিনীর আগ্রাসী আচরণের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে বলে সূত্র জানায়।অন্যদিকে, ভারতীয় পক্ষ সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশি নাগরিকদের অনুপ্রবেশ (তাদের ভাষায়) বন্ধে কঠোর হওয়ার বার্তা দিয়েছে বলে জানা গেছে।পশ্চিমবঙ্গের ভূমিকাভারত-বাংলাদেশের মোট ৪,০৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ আন্তর্জাতিক সীমান্তের অর্ধেকেরও বেশি (২,২১৬ কিলোমিটার) পশ্চিমবঙ্গে অবস্থিত। সীমান্তের প্রায় ৮৬০ কিলোমিটার অংশ এখনও কাঁটাতারের বেড়াবিহীন রয়েছে, যার মধ্যে ১৭৪.৫১ কিলোমিটার এমন এলাকা রয়েছে যেখানে বেড়া নির্মাণ সম্ভব নয়।পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সরকার ইতিমধ্যেই ঘোষণা করেছে যে তারা অবৈধ বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেবে। তাদের ভাষায়—অনুপ্রবেশকারী ব্যক্তিদের ‘ডিটেক্ট, ডিলিট অ্যান্ড ডিপোর্ট’ বা শনাক্ত, তালিকা থেকে বাদ এবং বহিষ্কারের পর্যায়ক্রমিক থ্রিডি অ্যাকশনের মুখোমুখি হতে হবে।এই বক্তব্য নিয়ে বাংলাদেশে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, “আমাদের কোনো নাগরিক অবৈধভাবে সীমান্ত পার হচ্ছে—এমন কোনো প্রমাণ এখনো তারা পায়নি। পুশইনের চেষ্টা ও গুলি চালানো বন্ধ করাই দুই দেশের স্বার্থে।”আলোচনার ইতিহাসপ্রসঙ্গত, দুই দেশের মধ্যে ডিজি-স্তরের সীমান্ত বৈঠক ১৯৭৫ থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর অনুষ্ঠিত হতো। তবে ১৯৯৩ সালে এটিকে বছরে দু’বার আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। যেখানে উভয়পক্ষ পর্যায়ক্রমে নয়াদিল্লি ও ঢাকায় বৈঠকে অংশ নেয়।বিএসএফ-বিজিবি সর্বশেষ বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০২৫ সালের আগস্টে ঢাকায়। তখন বাংলাদেশে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতায় ছিল।সাংবাদিক সম্মেলন না হওয়ার তাৎপর্যএবারের বৈঠকে যৌথ সংবাদ সম্মেলন না হওয়াকে অনেকে ‘কূটনৈতিক শীতলতা’ হিসেবে দেখছেন। সূত্র জানিয়েছে, ‘পুশইন’ ও সীমান্ত হত্যার ঘটনায় বাংলাদেশের তীব্র অবস্থানের কারণে ভারতীয় পক্ষ চাপ অনুভব করেছে। পশ্চিমবঙ্গের নতুন সরকারের কঠোর বক্তব্যও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে নতুন টানাপড়েন সৃষ্টি করেছে।ভারতীয় সংবাদমাধ্যম সূত্রে আরও জানা গেছে, উভয়পক্ষ সীমান্ত অপরাধ, চোরাচালান, মাদক পাচার ও মানবপাচারসহ বেশ কয়েকটি বিষয়ে আলোচনা করেছে। তবে ‘যৌথ বিবৃতিতে’ কী থাকছে, সেদিকে তাকিয়ে রয়েছে উভয় দেশের কূটনীতিক মহল।এখন পর্যন্ত ভারতীয় বিএসএফ বা বাংলাদেশের বিজিবি কেউই আনুষ্ঠানিক কোনো প্রেস বিবৃতি দেয়নি। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে যৌথ বিবৃতি প্রকাশিত হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। সেখানে কোনো সমঝোতা হয়েছে কিনা, নাকি আলোচনা অনিশ্চিত অবস্থায় শেষ হয়েছে—তা পরিষ্কার হবে।

গণবার্তা

সম্পাদকঃ নূর মোহাম্মদ
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্ব সংরক্ষিত গণবার্তা