দুই মাস বয়সী শিশুপুত্রকে আছাড় দিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে তারই বাবার বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় অভিযুক্ত বাবা সুলতানকে আটক করেছে পুলিশ। বৃহস্পতিবার দিবাগত সন্ধ্যায় ফেনীর ফুলগাজী থানার ভূমি অফিসের পাশে মেম্বার কলোনির একটি ভাড়া বাসায় এ ঘটনা ঘটে। নিহত শিশুটির নাম জুনায়েদ।
গুরুতর আহত অবস্থায় শিশুটিকে ফেনী জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
শিশুটির মা রুনা আক্তার অভিযোগ করেন, তার স্বামী সুলতান দীর্ঘদিন ধরে মাদকাসক্ত। এর আগেও কয়েকবার তাদের শিশুসন্তানের ক্ষতি করার চেষ্টা করেছিলেন তিনি। বৃহস্পতিবার রাতে নেশাগ্রস্ত অবস্থায় শিশুটিকে কোলে নিয়ে একপর্যায়ে আছাড় দিলে সে গুরুতর আহত হয়। পরে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হলেও তাকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
মা অভিযোগ করে বলেন, “আমি চিৎকার করলে তিনি বললেন, ‘এটা আমার ছেলে, আমি যা করব করব।’ আমি তার হাত থেকে শিশুটিকে ছিনিয়ে নিতে পারিনি। একপর্যায়ে তিনি আছাড় মেরে ফেলে দেন।”
পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সুলতান দাবি করেছেন, তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে সন্তানকে হত্যা করেননি। সন্তানকে নিয়ে খেলাধুলার সময় অসাবধানতাবশত তার হাত থেকে পড়ে গিয়ে এ দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে তিনি জানিয়েছেন।
তবে মা ও স্থানীয়দের দাবি সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রতিবেশীরা জানান, ঘটনার পর সুলতান বেশ অস্বাভাবিক আচরণ করছিলেন। তিনি নিজেও আহত অবস্থায় হাসপাতালে যান এবং বিভিন্ন তথ্য গোপন করার চেষ্টা করেন।
জানা গেছে, সুলতানের বাড়ি নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলার ডাকঘর এলাকায় ও রুনা আক্তারের বাড়ি একই উপজেলার বাহাড়তলা এলাকায়। কয়েক বছর আগে তারা ফেনীর ফুলগাজীতে এসে বসবাস শুরু করেন। সুলতান বিভিন্ন স্থানে দিনমজুর ও শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। সংসারে অভাব থাকলেও স্বামীর মাদকাসক্তি পরিবারকে চরম দূরবস্থার দিকে ঠেলে দেয় বলে জানান প্রতিবেশীরা।
স্থানীয়দের ভাষ্য, ঘটনার পর এলাকায় তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। মাত্র দুই মাস বয়সী একটি শিশুর এ মর্মান্তিক মৃত্যুতে শোক ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন প্রতিবেশীরা।
স্থানীয় বাসিন্দা আবুল কালাম বলেন, “শুধু বাবা কী করে এত নিষ্ঠুর হতে পারে? দুই মাসের বাচ্চা, যার মুখ দেখলেই বাবার মন ভরে যাওয়ার কথা, তাকেই এভাবে শেষ করল!”
আরেক প্রতিবেশী হোসনেয়ারা বেগম বলেন, “ঘটনার পর ওই বাবাকে আমরা বিকৃত অবস্থায় দেখেছি। তার চোখ-মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছিল সে নেশাগ্রস্ত। মাদক ওই বাবাকে পশু বানিয়ে ফেলেছিল।”
ফেনী জেনারেল হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. তানভীর মাহমুদ বলেন, “রাতে শিশুটিকে হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর দেখা যায়, হাসপাতালে আনার আগেই তার মৃত্যু হয়েছে। বর্তমানে মরদেহ হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে।”
ফুলগাজী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এস এম মিজানুর রহমান বলেন, “ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। শিশুটির মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত করতে মরদেহের ময়নাতদন্ত করা হবে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন ও তদন্তের ভিত্তিতে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, সুলতানকে ইতিমধ্যে আটক করা হয়েছে। তাকে ফুলগাজী থানায় রাখা হয়েছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। ঘটনার পূর্ণ উদঘাটনে শিশুটির মা ও প্রতিবেশীদের আরও বিস্তারিত জবানবন্দি নেওয়া হবে।
এ ঘটনায় ফুলগাজী থানায় মামলার প্রস্তুতি চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। মাদকের নেশা কীভাবে একটি পরিবারকে ধ্বংস করে দিতে পারে—এই ঘটনা তারই এক নৃশংস উদাহরণ হয়ে থাকল। শিশুটি মায়ের কোল থেকে ছিনিয়ে নেওয়ার এই কাহিনী যেন আর কোনো পরিবারে না ঘটে, সেজন্য সবার সচেতন হওয়া জরুরি।

শুক্রবার, ১২ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১২ জুন ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন