দীর্ঘ আইনি লড়াই ও বাধা পেরিয়ে অবশেষে ২৭ বছর আগে জন্ম নেওয়া আরিয়ান নামে এক যুবককে সন্তানের স্বীকৃতি দিয়েছেন তার বাবা। চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার পোমরা গ্রামের এ ঘটনায় স্বস্তি ফিরেছে সংশ্লিষ্ট দুই পরিবারে।
জানা যায়, শিশুটির যখন জন্ম হয়, তখন বাবা বিদেশে ছিলেন। জন্মের আগেই মা-বাবার বিবাহবিচ্ছেদ হয়ে যায়। বাবাকে না দেখেই মামার বাড়িতে বড় হতে থাকে শিশুটি। বড় হওয়ার পর তিনি জানতে পারেন তার বাবা বিদেশ থেকে ফিরে আরেকটি বিয়ে করেছেন এবং দেশেই আছেন।
বাবার মুখোমুখি হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন ছেলে। চান স্বীকৃতি। কিন্তু বাবা তাকে ছেলে হিসেবে মানতে নারাজ ছিলেন। একপর্যায়ে জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থা লিগ্যাল এইডের চট্টগ্রাম কার্যালয়ে বাবার স্বীকৃতি চেয়ে আবেদন করেন আরিয়ান। অবশেষে মঙ্গলবার বাবার কাছ থেকে সেই স্বীকৃতি পেলেন তিনি।
গতকাল দুপুরে চট্টগ্রাম জেলা লিগ্যাল এইড কার্যালয়ে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার (সহকারী সিভিল জজ) সুব্রত দাশের সভাপতিত্বে একটি মধ্যস্থতা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় আইন সহায়তা প্রদান আইন, ২০০০-এর ২১গ ধারার বিধান অনুযায়ী পিতা মুরশেদ ও তার ছেলে আরিয়ানের মধ্যে একটি মধ্যস্থতা চুক্তি সম্পাদিত হয়। চট্টগ্রাম জেলা লিগ্যাল এইড অফিসের অফিস সহকারী মোহাম্মদ এরশাদুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
আদালতের নির্দেশে মা, বাবা ও ছেলের ডিএনএ পরীক্ষা করা হয়েছিল। সেখানেই নিশ্চিত হওয়া যায়, ছেলের দাবি সঠিক। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ডিএনএ প্রতিবেদনটি লিগ্যাল এইড কার্যালয়ে পাঠায়। মঙ্গলবার সেখানে বাবা ছেলেকে সন্তান হিসেবে স্বীকৃতি দেন।
পাশাপাশি সম্পত্তিতে উত্তরাধিকার, ঘর করার জন্য দুই লাখ টাকা, পাড়া-প্রতিবেশী ও আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে সন্তানকে পরিচয় করে দেওয়ার লিখিত অঙ্গীকারনামাও করেন বাবা মুরশেদ।
লিগ্যাল এইড চট্টগ্রাম কার্যালয়ের লিগ্যাল এইড কর্মকর্তা সুব্রত দাশ বলেন, “বাবা তার সন্তানকে স্বীকৃতি দিয়েছেন। দুজন দুজনকে বুকে জড়িয়ে ধরেছেন।” লিগ্যাল এইড চট্টগ্রামের পক্ষ থেকে তাদের দুজনকে টি-শার্ট উপহার দেওয়া হয় দীর্ঘদিনের বিরোধ মীমাংসায় এগিয়ে আসায়।
চট্টগ্রাম জেলা লিগ্যাল এইড অফিস সূত্র জানায়, আরিয়ানের জন্ম রাঙ্গুনিয়া উপজেলার পোমরা গ্রামে। তার জন্মের সময় বাবা মুরশেদ প্রবাসে ছিলেন। জন্মের কিছুদিন পরই আরিয়ানের মা-বাবার বিচ্ছেদ ঘটে। পরে আরিয়ানের মা অন্যত্র বিয়ে করলে তিনি মামার বাড়িতে আশ্রয় নেন এবং সেখানেই বেড়ে ওঠেন।
দীর্ঘদিন ধরে তিনি বাবা মুরশেদের কাছ থেকে সন্তানের স্বীকৃতি পাননি। অবশেষে পিতৃত্বের স্বীকৃতি পাওয়ার আশায় ২০২৪ সালে মাকে সঙ্গে নিয়ে চট্টগ্রাম জেলা লিগ্যাল এইড অফিসে অভিযোগ করেন আরিয়ান। সেখানে হাজির হন বাবা, কিন্তু ছেলেকে নিজ সন্তান হিসেবে মেনে নিতে রাজি ছিলেন না।
পরে আদালতের নির্দেশে ডিএনএ পরীক্ষা করা হলে প্রমাণ মেলে ছেলের দাবিই সঠিক। ডিএনএ প্রতিবেদন পেয়ে বাবা অবশেষে ছেলেকে মেনে নেন। টেনে নেন নিজের বুকে।
জন্মের ২৭ বছর পর স্বীকৃতি পেয়ে খুশি আরিয়ান। তিনি বলেন, “এত বছর বাবার পরিচয় দিতে পারতাম না। লোকজন নানা কথা বলত। এখন বাবা সন্তান হিসেবে মেনে নেওয়ায় সমাজে আর কারও কটু কথা শুনতে হবে না। এটি অনেক বড় আনন্দের।”

বুধবার, ১০ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১০ জুন ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন