দেশে অনলাইন ও অফলাইন জুয়া ও বেটিং–সংশ্লিষ্ট অপরাধ প্রতিরোধে বিশেষ আইন প্রণয়নের সরকারি উদ্যোগকে নীতিগতভাবে স্বাগত জানিয়েছে হিউমান রাইটস ফোরাম বাংলাদেশ (এইচআরএফবি)। তবে প্রস্তাবিত আইনের কয়েকটি ধারা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে তা পুনর্বিবেচনার মাধ্যমে সংশোধন বা প্রয়োজনে বাতিলের আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।
গতকাল মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে এ আহ্বান জানিয়ে এইচআরএফবি বলেছে, জাতীয় সংসদে উপস্থাপনের আগে বেটিং এবং জুয়া প্রতিরোধ আইন (অনলাইন ও অফলাইন), ২০২৬–এর খসড়ার উদ্বেগজনক ধারাগুলো পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
বেটিং ও জুয়া প্রতিরোধ আইনের খসড়া পর্যালোচনা করেছে এইচআরএফবি। তারা মনে করে, অপরাধ দমনের উদ্দেশ্যে প্রণীত কোনো আইন এমন হওয়া উচিত নয়, যা ভবিষ্যতে নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার, ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকার, ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা এবং বিচারিক সুরক্ষাকে সংকীর্ণ করার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
সংগঠনটি বলেছে, প্রস্তাবিত আইনের ৩৯(১) ও ৩৯(২) ধারায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বা ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের কেবল ‘বিশ্বাস’ বা ‘সন্দেহের’ ভিত্তিতে কোনো ব্যক্তির ডিজিটাল ডিভাইসে প্রবেশ, তল্লাশি, তথ্য সংগ্রহ, জব্দ ও গ্রেপ্তারের ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাব আছে।
এসব ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে বিচারিক অনুমোদন, স্বাধীন তদারকি ও কার্যকর জবাবদিহির পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকলে তা নজরদারিনির্ভর রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে মনে করে এইচআরএফবি।
বিবৃতিতে বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭, ৩১, ৩২, ৩৩, ৩৯ ও ৪৩ অনুচ্ছেদের উল্লেখ করে বলা হয়, এসব অনুচ্ছেদে নাগরিকের সমতা, ব্যক্তিস্বাধীনতা, গ্রেপ্তারসংক্রান্ত অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তার সুরক্ষা নিশ্চিত করা হয়েছে। তাই কোনো ব্যক্তির ডিজিটাল ডিভাইস বা ব্যক্তিগত তথ্যে প্রবেশের ক্ষমতা অবশ্যই সাংবিধানিক অধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।
এ ছাড়া খসড়া আইনে ভ্রাম্যমাণ আদালতকে যে ধরনের ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে, সেটিও যথাযথ পর্যালোচনার দাবি রাখে বলে উল্লেখ করেছে সংগঠনটি।
এইচআরএফবি বলেছে, জুয়া ও বেটিং নিয়ন্ত্রণসংক্রান্ত আইনটি অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু আইনের লক্ষ্য অর্জনের জন্য এমন কোনো ধারা প্রণয়ন করা উচিত নয়, যা ব্যাপক নজরদারি, ব্যক্তিগত গোপনীয়তায় হস্তক্ষেপ বা ক্ষমতার অপব্যবহারের ঝুঁকি তৈরি করে।
আইনবিদ, প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ, গণমাধ্যম প্রতিনিধি ও নাগরিক সমাজের অংশগ্রহণে উন্মুক্ত পর্যালোচনার মাধ্যমে আইনটিকে সংবিধান, উচ্চ আদালতের নির্দেশনা এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার আহ্বান জানিয়েছে এইচআরএফবি।
বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে রয়েছেন—
হামিদা হোসেন, সুলতানা কামাল, রাজা দেবাশীষ রায় (এইচআরএফবি এক্সপার্ট)
জেড আই খান পান্না (আইন ও সালিশ কেন্দ্রের চেয়ারপারসন)
তাহমিনা রহমান (আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক ও এইচআরএফবির আহ্বায়ক)
স্টিয়ারিং কমিটির সদস্য: শাহীন আনাম, জাকির হোসেন, সারা হোসেন, রঞ্জন কর্মকার, সালেহ আহমেদ, সঞ্জীব দ্রং।
অন্যান্য স্বাক্ষরকারী সদস্যরা হলেন—
ইফতেখারুজ্জামান (টিআইবির নির্বাহী পরিচালক)
ফওজিয়া মোসলেম (বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভানেত্রী)
শামসুল হুদা (অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্মস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক)
খুশী কবির (নিজেরা করির সমন্বয়ক)
সরদার জাহাঙ্গীর হোসেন (অ্যাসিড সারভাইভার্স ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক)
শিপন কুমার রবিদাস (বাংলাদেশ দলিত ও বঞ্চিত জনগোষ্ঠী অধিকার আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক)
সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ (বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক)
দেওয়ান জামান (ফেয়ারের নির্বাহী পরিচালক)
এইচআরএফবির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আইনটি প্রণয়নের আগে এসব উদ্বেগ আমলে নিয়ে প্রয়োজনীয় সংশোধন আনা উচিত, যাতে অপরাধ দমন যেমন নিশ্চিত হয়, তেমনি নাগরিকদের মৌলিক অধিকারও সুরক্ষিত থাকে।

বুধবার, ১০ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১০ জুন ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন