ঢাকা    শনিবার, ২০ জুন ২০২৬
ঢাকা    শনিবার, ২০ জুন ২০২৬
গণবার্তা

পাকিস্তানের অধিকৃত কাশ্মিরে বিক্ষোভে ২৪ নিহত, ৫১৫ গ্রেপ্তার

পাকিস্তানের অধিকৃত কাশ্মিরে বিক্ষোভে ২৪ নিহত, ৫১৫ গ্রেপ্তার

অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক সংস্কারের দাবিতে বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে উঠেছে পাকিস্তানের অধিকৃত কাশ্মিরের আজাদ কাশ্মির অঞ্চল। পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে ইতিমধ্যে সেখানে নিহত হয়েছেন ২৪ জন। ১৯৪৭ সালে জম্মু-কাশ্মিরের দু’টি অঞ্চল দখল করে পাকিস্তান—আজাদ কাশ্মির এবং গিলগিট-বাল্টিস্তান। দু’টিই পাকিস্তানের কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল এবং দু’টিতেই প্রাদেশিক আইনসভা বা বিধানসভা রয়েছে। আজাদ কাশ্মিরের বিধানসভায় আসনসংখ্যা ৪৫টি। সেই ৪৫টি আসনের মধ্যে আবার ১২টি আসন ভারতের জম্মু-কাশ্মির থেকে আসা উদ্বাস্তুদের জন্য সংরক্ষিত। বিধানসভায় সংরক্ষণ ব্যবস্থা তুলে দেওয়া এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধির দাবিতে গত ৫ জুন থেকে আন্দোলন শুরু করে আজাদ কাশ্মিরভিত্তিক রাজনৈতিক দল জয়েন্ট আওয়ামী অ্যাকশন কমিটি (জেএএকে)। আন্দোলনের অংশ হিসেবে ৯ জুন হরতালও ডাকে জেএএকে। মূলত সেই হরতাল থেকেই পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘাত শুরু হয় জেএএকের।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর বরাতে জানা গেছে, আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে গত প্রায় দু’সপ্তাহে নিহত হয়েছেন ২৪ জন, আহত হয়েছেন আরও বহুসংখ্যক। সেইসঙ্গে বিক্ষোভে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে এ পর্যন্ত জেএএকের ৫১৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এছাড়া বিক্ষোভকারীদের ছোড়া ইট-পাটকেলে গত প্রায় দু’সপ্তাহে ৯৭ জন পুলিশ কর্মকর্তা এবং বেশ কয়েকজন পুলিশসদস্য আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। আজাদ কাশ্মিরের পুলিশপ্রধান লিয়াকত আলী মালিক এএফপিকে জানান, বিক্ষোভের মূল কেন্দ্র এখন রাওয়ালকোট শহর। এই শহরটি আজাদ কাশ্মিরের রাজধানী মুজাফফরাবাদ থেকে ১০০ কিলোমিটার দক্ষিণে। বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে ইতোমধ্যে কারফিউ জারি করেছে পুলিশ। শহরের মূল সড়কগুলো এবং ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে; ব্যাপকমাত্রায় সীমিত করা হয়েছে সংবাদমাধ্যমের উপস্থিতিও। এদিকে বিক্ষোভ-সংঘর্ষ ও কারফিউয়ের কারণে কার্যত অচল হয়ে পড়েছে আজাদ কাশ্মির। খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ তীব্রভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। মুজাফফরাবাদের বাসিন্দা মুহম্মদ মাসকিন এএফপিকে বলেন, “আমি ওষুধের জন্য গত কয়েকদিন ধরে ঘুরছি, এখনও পাইনি। এমনকি অনেক বড় ওষুধের দোকানগুলো পর্যন্ত বন্ধ। যেসব দোকান খোলা, সেগুলোর সরবরাহ শেষ হয়ে গেছে।” আরেক বাসিন্দা সাবার হোসেন বলেন, “গত আটদিন ধরে আমরা খুব কঠিন সময় পার করছি। বাজারগুলো বন্ধ আছে। শাক-সবজি ছাড়া কিছুই পাওয়া যাচ্ছে না।”

আন্দোলনকারীরা মূলত আজাদ কাশ্মির বিধানসভায় উদ্বাস্তুদের জন্য সংরক্ষিত ১২টি আসন বিলুপ্তির দাবি জানাচ্ছেন। তাদের অভিযোগ, এই সংরক্ষণ ব্যবস্থা স্থানীয় কাশ্মিরিদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে প্রান্তিক করে রেখেছে। তারা কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও অবকাঠামো উন্নয়নের দাবিও তুলেছেন। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার অবশ্য সংরক্ষণ ব্যবস্থা প্রত্যাহারের দাবি মেনে নিতে রাজি নয়। ইসলামাবাদের এক কর্মকর্তা জানান, এই সংরক্ষণ ব্যবস্থা ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে তৈরি হয়েছিল এবং এটি বাতিল হলে ভারতে বসবাসরত কাশ্মিরি উদ্বাস্তুদের অধিকার হরণ করা হবে। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হলে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ একটি জরুরি বৈঠক ডেকেছেন। তবে বৈঠকের পর কোনো প্রেস বিবৃতি বা সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি। মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এই সংঘর্ষের তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছে, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের ওপর বলপ্রয়োগ বন্ধ করতে হবে এবং নিহতদের ঘটনার স্বাধীন তদন্ত করতে হবে। জাতিসংঘও পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে সব পক্ষকে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছে। স্থানীয় সাংবাদিকরা জানিয়েছেন, চলমান সংকটে আজাদ কাশ্মিরের জনজীবন সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত। স্কুল-কলেজ বন্ধ, সরকারি অফিসে কর্মচারীদের উপস্থিতি নেই এবং জরুরি সেবা ছাড়া সবকিছু অচল। বিক্ষোভকারীরা বলছেন, দাবি না মানা পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। অন্যদিকে পুলিশ বলছে, আইনশৃঙ্খলা ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আগামী কয়েকদিন এই পরিস্থিতি কী মোড় নেয়, তা নিয়ে উদ্বিগ্ন আন্তর্জাতিক মহল।

আপনার মতামত লিখুন

গণবার্তা

শনিবার, ২০ জুন ২০২৬


পাকিস্তানের অধিকৃত কাশ্মিরে বিক্ষোভে ২৪ নিহত, ৫১৫ গ্রেপ্তার

প্রকাশের তারিখ : ২০ জুন ২০২৬

featured Image
অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক সংস্কারের দাবিতে বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে উঠেছে পাকিস্তানের অধিকৃত কাশ্মিরের আজাদ কাশ্মির অঞ্চল। পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে ইতিমধ্যে সেখানে নিহত হয়েছেন ২৪ জন। ১৯৪৭ সালে জম্মু-কাশ্মিরের দু’টি অঞ্চল দখল করে পাকিস্তান—আজাদ কাশ্মির এবং গিলগিট-বাল্টিস্তান। দু’টিই পাকিস্তানের কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল এবং দু’টিতেই প্রাদেশিক আইনসভা বা বিধানসভা রয়েছে। আজাদ কাশ্মিরের বিধানসভায় আসনসংখ্যা ৪৫টি। সেই ৪৫টি আসনের মধ্যে আবার ১২টি আসন ভারতের জম্মু-কাশ্মির থেকে আসা উদ্বাস্তুদের জন্য সংরক্ষিত। বিধানসভায় সংরক্ষণ ব্যবস্থা তুলে দেওয়া এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধির দাবিতে গত ৫ জুন থেকে আন্দোলন শুরু করে আজাদ কাশ্মিরভিত্তিক রাজনৈতিক দল জয়েন্ট আওয়ামী অ্যাকশন কমিটি (জেএএকে)। আন্দোলনের অংশ হিসেবে ৯ জুন হরতালও ডাকে জেএএকে। মূলত সেই হরতাল থেকেই পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘাত শুরু হয় জেএএকের।আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর বরাতে জানা গেছে, আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে গত প্রায় দু’সপ্তাহে নিহত হয়েছেন ২৪ জন, আহত হয়েছেন আরও বহুসংখ্যক। সেইসঙ্গে বিক্ষোভে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে এ পর্যন্ত জেএএকের ৫১৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এছাড়া বিক্ষোভকারীদের ছোড়া ইট-পাটকেলে গত প্রায় দু’সপ্তাহে ৯৭ জন পুলিশ কর্মকর্তা এবং বেশ কয়েকজন পুলিশসদস্য আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। আজাদ কাশ্মিরের পুলিশপ্রধান লিয়াকত আলী মালিক এএফপিকে জানান, বিক্ষোভের মূল কেন্দ্র এখন রাওয়ালকোট শহর। এই শহরটি আজাদ কাশ্মিরের রাজধানী মুজাফফরাবাদ থেকে ১০০ কিলোমিটার দক্ষিণে। বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে ইতোমধ্যে কারফিউ জারি করেছে পুলিশ। শহরের মূল সড়কগুলো এবং ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে; ব্যাপকমাত্রায় সীমিত করা হয়েছে সংবাদমাধ্যমের উপস্থিতিও। এদিকে বিক্ষোভ-সংঘর্ষ ও কারফিউয়ের কারণে কার্যত অচল হয়ে পড়েছে আজাদ কাশ্মির। খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ তীব্রভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। মুজাফফরাবাদের বাসিন্দা মুহম্মদ মাসকিন এএফপিকে বলেন, “আমি ওষুধের জন্য গত কয়েকদিন ধরে ঘুরছি, এখনও পাইনি। এমনকি অনেক বড় ওষুধের দোকানগুলো পর্যন্ত বন্ধ। যেসব দোকান খোলা, সেগুলোর সরবরাহ শেষ হয়ে গেছে।” আরেক বাসিন্দা সাবার হোসেন বলেন, “গত আটদিন ধরে আমরা খুব কঠিন সময় পার করছি। বাজারগুলো বন্ধ আছে। শাক-সবজি ছাড়া কিছুই পাওয়া যাচ্ছে না।”আন্দোলনকারীরা মূলত আজাদ কাশ্মির বিধানসভায় উদ্বাস্তুদের জন্য সংরক্ষিত ১২টি আসন বিলুপ্তির দাবি জানাচ্ছেন। তাদের অভিযোগ, এই সংরক্ষণ ব্যবস্থা স্থানীয় কাশ্মিরিদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে প্রান্তিক করে রেখেছে। তারা কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও অবকাঠামো উন্নয়নের দাবিও তুলেছেন। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার অবশ্য সংরক্ষণ ব্যবস্থা প্রত্যাহারের দাবি মেনে নিতে রাজি নয়। ইসলামাবাদের এক কর্মকর্তা জানান, এই সংরক্ষণ ব্যবস্থা ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে তৈরি হয়েছিল এবং এটি বাতিল হলে ভারতে বসবাসরত কাশ্মিরি উদ্বাস্তুদের অধিকার হরণ করা হবে। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হলে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ একটি জরুরি বৈঠক ডেকেছেন। তবে বৈঠকের পর কোনো প্রেস বিবৃতি বা সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি। মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এই সংঘর্ষের তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছে, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের ওপর বলপ্রয়োগ বন্ধ করতে হবে এবং নিহতদের ঘটনার স্বাধীন তদন্ত করতে হবে। জাতিসংঘও পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে সব পক্ষকে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছে। স্থানীয় সাংবাদিকরা জানিয়েছেন, চলমান সংকটে আজাদ কাশ্মিরের জনজীবন সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত। স্কুল-কলেজ বন্ধ, সরকারি অফিসে কর্মচারীদের উপস্থিতি নেই এবং জরুরি সেবা ছাড়া সবকিছু অচল। বিক্ষোভকারীরা বলছেন, দাবি না মানা পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। অন্যদিকে পুলিশ বলছে, আইনশৃঙ্খলা ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আগামী কয়েকদিন এই পরিস্থিতি কী মোড় নেয়, তা নিয়ে উদ্বিগ্ন আন্তর্জাতিক মহল।

গণবার্তা

সম্পাদকঃ নূর মোহাম্মদ
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্ব সংরক্ষিত গণবার্তা