আসন্ন সাধারণ নির্বাচনে জয়ী হয়ে পুনরায় ক্ষমতায় ফিরে এলে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের সমস্ত সম্ভাবনা সম্পূর্ণভাবে নাকচ করে দিয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তিনি সাংবাদিকদের স্পষ্ট করে জানিয়েছেন যে ভূমধ্যসাগর থেকে জর্ডান নদী পর্যন্ত বিস্তৃত ভূখণ্ডে দুটি পৃথক স্বাধীন রাষ্ট্র টিকে থাকার মতো কোনো জায়গা নেই। তিনি যে জাতীয় সরকারের নেতৃত্ব দেওয়ার পরিকল্পনা করছেন, এটি তার অন্যতম প্রধান নীতি হবে বলেও উল্লেখ করেন। নেতানিয়াহু সাংবাদিকদের বলেন যে, ‘আমি যে জাতীয় সরকারের নেতৃত্ব দেওয়ার ইচ্ছা পোষণ করছি, তার আরেকটি অন্যতম মূল নীতি হলো এখানে দুটি রাষ্ট্রের জন্য কোনো জায়গা নেই। সমুদ্র এবং জর্ডান নদীর মধ্যবর্তী অঞ্চলে দুই রাষ্ট্রের কোনো অস্তিত্ব থাকতে পারে না।’
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন যে তিন বছর আগে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পূর্বে এই দুই রাষ্ট্র গঠনের বিষয়ে ইসরায়েলি জনগণের মধ্যে তীব্র বিভাজন ছিল। যদিও তার বিশ্বাস অনুযায়ী দেশটির অধিকাংশ মানুষই ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের বিপক্ষে ছিলেন, তবুও একটি উল্লেখযোগ্য অংশ একে সমর্থন করতেন। তবে বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জনগণের সেই মানসিকতায় বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে এবং এটি এখন সবার মধ্যে একটি জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে পরিণত হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। এর আগে লেবাননের সঙ্গে সম্পাদিত ফ্রেমওয়ার্ক চুক্তিটিকে একটি ঐতিহাসিক অর্জন হিসেবে বর্ণনা করেছেন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী। নেতানিয়াহু দাবি করেন যে বৈরুতের সঙ্গে হওয়া এই দ্বিপাক্ষিক বোঝাপড়া মূলত ইরান এবং তাদের সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর ওপর একটি মারাত্মক আঘাত। লেবানন ও আমেরিকার সঙ্গে হওয়া এই নতুন আন্তর্জাতিক বোঝাপড়ার ফলে দক্ষিণ লেবাননের অভ্যন্তরে একটি নির্দিষ্ট নিরাপত্তা বলয় বজায় রাখার ক্ষেত্রে ইসরায়েলের অধিকারকে সম্পূর্ণভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। তেল আবিব তাদের নিজস্ব নিরাপত্তার স্বার্থে যতদিন প্রয়োজন মনে করবে, ঠিক ততদিনই ওই অঞ্চলের ওপর নিজেদের সামরিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে পারবে বলে তিনি জানান।
নেতানিয়াহুর এই ঘোষণা আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ এই বক্তব্যের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। তারা বলেছে, ‘এটি আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘের প্রস্তাবের সরাসরি লঙ্ঘন। নেতানিয়াহু শান্তি প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করার চেষ্টা করছেন।’ অন্যদিকে, হামাস এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘নেতানিয়াহুর এই বক্তব্য আমাদের সংগ্রামের পথকে আরও স্পষ্ট করেছে। ফিলিস্তিনি জনগণ কখনো তাদের ভূমি ছেড়ে যাবে না।’ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও এই ঘোষণায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। জাতিসংঘের মহাসচিব বলেছেন, ‘দুই রাষ্ট্র সমাধানই এই সংঘাতের একমাত্র টেকসই সমাধান। নেতানিয়াহুর বক্তব্য এই প্রক্রিয়াকে হুমকির মুখে ফেলছে।’ যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, তারা নেতানিয়াহুর এই বক্তব্য পর্যালোচনা করছে এবং দুই রাষ্ট্র সমাধানের প্রতি তাদের সমর্থন অটুট রয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতি প্রধান বলেছেন, ‘আমরা নেতানিয়াহুর বক্তব্যে হতাশ। দুই রাষ্ট্র সমাধানই আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পথ।’ এই ঘোষণার পর ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। বিরোধী দল নেতা ইয়াইর লাপিদ বলেছেন, ‘নেতানিয়াহু দেশকে আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতার দিকে ঠেলে দিচ্ছেন। তার এই নীতি ইসরায়েলের নিরাপত্তার জন্য ক্ষতিকর।’ অন্যদিকে, নেতানিয়াহুর ডানপন্থী জোটসঙ্গীরা এই ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়েছেন। তারা বলেছেন, ‘এটাই ইসরায়েলের প্রকৃত অবস্থান। ফিলিস্তিন রাষ্ট্র কখনোই প্রতিষ্ঠিত হবে না।’ রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, নেতানিয়াহু নির্বাচনী প্রচারণার অংশ হিসেবেই এই বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি তার ডানপন্থী ভোট ব্যাংককে শক্ত করতে চান। কিন্তু আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি ও ফিলিস্তিনিদের প্রতিরোধের মুখে এই নীতি বাস্তবায়ন করা কতটা সম্ভব, তা প্রশ্নবিদ্ধ। ইসরায়েলে আগামী মাসে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। নেতানিয়াহুর এই বক্তব্য নির্বাচনের ফলাফলকে প্রভাবিত করতে পারে। ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে উত্তেজনাও বাড়তে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা। আপাতত বিশ্ববাসী নেতানিয়াহুর বাস্তব পদক্ষেপের দিকে তাকিয়ে আছে।

রোববার, ২৮ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৮ জুন ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন