ইউরোপজুড়ে রেকর্ড তাপমাত্রা। বাড়ছে প্রাণহানি। ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক জনজীবন। জার্মানি, ফ্রান্স ও ইতালিসহ বিভিন্ন দেশে জারি করা হয়েছে সর্বোচ্চ সতর্কতা। গত মঙ্গলবার ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী সেবাস্টিয়ান লেকর্ন জানান, গত ১৮ জুন থেকে এ পর্যন্ত গরম থেকে বাঁচতে পানিতে ডুবেই দেশটিতে অন্তত ৪০ জনের প্রাণহানি হয়েছে। গত দুই দিনে তীব্র গরমে ফ্রান্সে ৩ জন শিশুর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে দেশটির সংবাদমাধ্যম। এছাড়া প্যারিসে গত ২৪ ঘণ্টায় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ২৫ জন মারা গেছেন, যেখানে গড় স্বাভাবিক মৃত্যুর সংখ্যা ১০-এর নিচে থাকে। দেশটিতে তাপজনিত কারণে জরুরি বিভাগে রোগী ভর্তির হার ইতিমধ্যে চার গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
অতিরিক্ত দাবদাহের কারণে স্পেনে গত রোববার থেকে বুধবারের মধ্যে আনুমানিক ২১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। ঐতিহাসিক তথ্য ও অতিরিক্ত মৃত্যুর হার বিশ্লেষণ করে এই আনুমানিক সংখ্যা জানিয়েছে দেশটির স্বাস্থ্য বিভাগ। ইতালিতেও তীব্র গরমে অন্তত ৫ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। ডেনমার্কের আবহাওয়া ইনস্টিটিউট জানিয়েছে শনিবার দেশটির ইতিহাসের সর্বোচ্চ ৩৬.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে। স্লোভাকিয়াও নিশ্চিত করেছে, গত শুক্রবার রাত তাদের ইতিহাসের উষ্ণতম রাত। আবহাওয়া পূর্বাভাস সাইট ডোনারওয়েটারের আবহাওয়াবিদ কার্স্টেন ব্র্যান্ড বলেছেন, ‘জার্মানির কিছু অংশে এই সপ্তাহের শেষে তাপপ্রবাহ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাবে এবং ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি ছাড়িয়ে যাবে।’ গত শুক্রবার ফ্রান্সের সীমান্তবর্তী জার্মানির সারব্রুকেন শহরের কাছে ৪১.৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নতুন রেকর্ড হয়েছে।
শনিবার জার্মানির আবহাওয়া অধিদপ্তর প্রায় পুরো দেশে চরম তাপপ্রবাহের সতর্কতা জারি করেছে এবং নাগরিকদের পানি সাশ্রয়ের নির্দেশ দিয়েছে। অন্যদিকে, ইতালির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় মিলান, রোম, ভেনিস, জেনোয়া, ফ্লোরেন্স এবং বোলোনিয়াসহ মোট ১৮টি শহরে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করেছে। ইতালির বোলজানো শহরের আবহাওয়াবিদ ডিটার পেটারলিন শুক্রবারের রাতকে ইতিহাসের উষ্ণতম জুন মাসের রাত হিসেবে অভিহিত করেন। ফ্রান্সে অত্যধিক তাপমাত্রার কারণে রেল যোগাযোগ ও বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। দেশটির অনেক জায়গায় সাময়িক মদ্যপান নিষিদ্ধ, স্কুল বন্ধ এবং উন্মুক্ত স্থানের বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠান স্থগিত করা হয়েছে। জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘ওমেগা ব্লক’ নামের একটি আবহাওয়াগত প্রক্রিয়ার কারণে এই তীব্র গরম বাতাস দীর্ঘ সময় ধরে আটকে রয়েছে, যার ফলে গড় মৌসুমী তাপমাত্রার চেয়ে ১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে।
তীব্র গরমে ইউরোপজুড়ে বৈদ্যুতিক পাখা ও এসি যন্ত্রপাতির বিক্রি ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে আগামীকাল রোববার থেকে বজ্রপাত ও ঝড়-বৃষ্টির সম্ভাবনা থাকায় সপ্তাহের শেষে গরমের তীব্রতা কিছুটা হ্রাস পেতে পারে বলে জানিয়েছে মহাদেশের বিভিন্ন আবহাওয়া অধিদপ্তর। এদিকে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সরকারগুলো দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রস্তুতি নিচ্ছে। ফ্রান্সের স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেছেন, তাপপ্রবাহ মোকাবিলায় হাসপাতালগুলোতে অতিরিক্ত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। জার্মানির পরিবেশমন্ত্রী নাগরিকদের বাড়িতে পর্যাপ্ত পানি সংরক্ষণের আহ্বান জানিয়েছেন। ইউরোপীয় আবহাওয়া সংস্থা জানিয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভবিষ্যতে এ ধরনের তাপপ্রবাহ আরও ঘন ঘন ও তীব্র আকার ধারণ করতে পারে। তারা কার্বন নির্গমন কমানোর ওপর জোর দিয়েছে। ইতিমধ্যে কয়েকটি ইউরোপীয় শহর হিট অ্যাকশন প্ল্যান চালু করেছে। এসব পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে কুলিং সেন্টার স্থাপন, পাবলিক ফোয়ারা চালু ও গরমের সময় কাজের সময়সূচি পরিবর্তন। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পদক্ষেপগুলো যথেষ্ট নয় এবং আরও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ প্রয়োজন। ইউরোপের তাপপ্রবাহ পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। তারা বলেছে, এই গরমে শিশু, বয়স্ক ও দীর্ঘমেয়াদি রোগীদের সবচেয়ে বেশি ঝুঁকি রয়েছে। আগামী কয়েক দিন ইউরোপের আবহাওয়া পরিস্থিতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকার ও জনগণকে একযোগে কাজ করতে হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

রোববার, ২৮ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৮ জুন ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন