বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ। এ দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে যাদের ঘাম ঝরে মাঠে-ঘাটে, তারা হলেন কৃষক। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে এই পেশাজীবী মানুষটি পেতেন না প্রাপ্য সম্মান, সুবিধা আর স্বীকৃতি। সেই বাস্তবতায় অনন্য এক উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। আর সেই উদ্যোগের শুভ সূচনা ঘটালেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
টাঙ্গাইলের শহীদ মারুফ স্টেডিয়ামে আজ মঙ্গলবার দুপুর সোয়া ১২টার দিকে এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে ‘কৃষক কার্ড’ বিতরণ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর এটি তাঁর প্রথম টাঙ্গাইল সফর। তাই দলীয় নেতা-কর্মী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে ছিল উৎসবের আমেজ। কৃষকের মুখে হাসি ফোটানোর এই উদ্যোগ যেন এক আনন্দমিছিলের সূচনা করলো।
অনুষ্ঠানের শুরুতেই প্রধানমন্ত্রী স্থানীয় ১৫ জন কিষান ও কিষানির হাতে কৃষক কার্ড ও গাছের চারা তুলে দেন। এই প্রতীকী হস্তান্তরের মাধ্যমে শুরু হলো দেশব্যাপী কার্ড বিতরণের যাত্রা।
প্রথম ধাপে সারা দেশের ১০টি জেলার ১১টি উপজেলায় প্রায় ২১ হাজার ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকের মধ্যে এই কার্ড বিতরণ করা হচ্ছে। যাদের অধিকাংশেরই আগে কোনো সামাজিক নিরাপত্তা বা কৃষি সহায়তার আওতায় ছিল না, তারাই এখন পাবে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করছেন কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন (টুকু)। পুরো আয়োজনটি ছিল অত্যন্ত পরিপাটি ও গোছানো – যেন কৃষকের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের এক অনুষ্ঠান।
কৃষক কার্ড শুধু একটি পরিচয়পত্র নয়; এটি একটি ১০ সুবিধার একীভূত প্যাকেজ। এই কার্ডের মাধ্যমে কৃষক, মৎস্যচাষি ও দুগ্ধ খামারিরা নিচের সুবিধাগুলো পাবেন:
নগদ প্রণোদনা – উৎপাদন অনুযায়ী সরাসরি প্রণোদনা।
ন্যায্যমূল্যে কৃষি উপকরণ – বীজ, সার, কীটনাশক সুলভ মূল্যে উপলব্ধ।
সেচসুবিধা – বিদ্যুৎ বা ডিজেলের ওপর ভর্তুকি।
সহজ শর্তে ঋণ – কাগজপত্র ও জামানতহীন স্বল্পসুদে কৃষিঋণ।
কৃষিবিমা – প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা ফসলের ক্ষতির বিরুদ্ধে বীমা কাভারেজ।
প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তি সহায়তা – আধুনিক কৃষি পদ্ধতি সম্পর্কে জ্ঞান।
সংরক্ষণ সুবিধা – গুদাম বা সাইলোতে ফসল রাখার ব্যবস্থা।
বাজারজাতকরণ সহায়তা – ন্যায্য দাম পেতে সরকারি বিপণন কেন্দ্রের সুবিধা।
কৃষি সরঞ্জাম ভর্তুকি – ট্রাক্টর, থ্রেসার, স্প্রে মেশিন ইত্যাদি কেনায় ছাড়।
জীবিকার সম্প্রসারণ – পাশাপাশি মৎস্য ও হাঁস-মুরগি পালনে উৎসাহ ও সহায়তা।
এত দিন কৃষকদের নানা সুবিধা ছিল বিক্ষিপ্ত; এবার সেগুলো একই কার্ডে একীভূত করে আনা হয়েছে। ফলে ভর্তুকি ও প্রণোদনা বিতরণে স্বচ্ছতা আসবে, মধ্যস্বত্বভোগীদের সুযোগ কমবে।
কৃষি কার্ড কেবল আজকের জন্য নয়; এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ। সরকার আগামী চার বছরে সারা দেশের ১ কোটি ৬৫ লাখ কৃষকের হাতে এই কার্ড পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। যা বাংলাদেশের ইতিহাসে কৃষি খাতে সবচেয়ে বড় অন্তর্ভুক্তিমূলক উদ্যোগ।
এই কর্মসূচির জন্য প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৬৮১ কোটি টাকা। সরকার আশা করছে, এই ব্যয়ের বিনিময়ে কৃষি উৎপাদন বাড়বে, গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙা হবে এবং কৃষকদের জীবনমানের ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
কার্যক্রম উদ্বোধনের আগের দিন সোমবার কৃষিমন্ত্রী আমিন উর রশিদ শহীদ মারুফ স্টেডিয়াম পরিদর্শনে এসে সাংবাদিকদের বিস্তারিত জানান। তিনি বলেন, প্রথমে টাঙ্গাইলসহ সারা দেশে ১১টি পয়েন্টে প্রি-পাইলটিং শুরু হবে। তারপর সেখান থেকে প্রাপ্ত অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে আরও বড় পরিসরে পাইলটিং করা হবে। সব ঠিক থাকলে খুব দ্রুত পুরো দেশেই বড় আকারে কৃষক কার্ড বিতরণ শুরু হবে।
মন্ত্রী আরও আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, আগামী চার বছরের মধ্যে সারা বাংলাদেশে কৃষক কার্ড বিতরণ শেষ হবে। এটি একটি চ্যালেঞ্জিং কাজ বটে, কিন্তু সরকারের পরিকল্পনা ও ডিজিটাল ইনফ্রাস্ট্রাকচার তা সম্ভব করে তুলবে বলে মনে করছেন তিনি।
কৃষক কার্ড বিতরণ উদ্বোধন শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শহরের শহীদ স্মৃতি পৌর উদ্যানে কৃষি মেলার উদ্বোধন করেন। এই মেলায় স্থানীয় কৃষকদের উৎপাদিত বিভিন্ন ফসল, ফলমূল, শাকসবজি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ পণ্য প্রদর্শিত হচ্ছে। কৃষি মেলার মাধ্যমে কৃষকদের উৎপাদিত পণ্যের বাজার সৃষ্টি এবং কৃষিপণ্যের ভিন্নতা তুলে ধরাই লক্ষ্য।
টাঙ্গাইলবাসী প্রধানমন্ত্রীর এই সফরকে ‘ঐতিহাসিক’ আখ্যা দিচ্ছেন। কারণ তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর এটি তাঁর প্রথম টাঙ্গাইল সফর। সেই সফরে তিনি কৃষকের জন্য এত বড় উপহার দিয়ে গেলেন – এটি স্থানীয় মানুষের কাছে অত্যন্ত ইতিবাচক বার্তা পৌঁছে দিয়েছে।
কৃষক কার্ডের পেছনে তিনটি মূল উদ্দেশ্য কাজ করছে:
পেশাজীবী হিসেবে কৃষকের স্বীকৃতি – ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, শিক্ষকের মতো তিনিও পেশাজীবী। কার্ড তার সেই মর্যাদা দেবে।
আয় বৃদ্ধি – ভর্তুকি ও সহজ ঋণের মাধ্যমে উৎপাদন খরচ কমে, লাভ বাড়ে।
ভর্তুকি বিতরণে স্বচ্ছতা – আগে অনেক সময় ভর্তুকি পৌঁছাত না প্রকৃত কৃষকের কাছে। কার্ডের মাধ্যমে সরাসরি ব্যাংকিং চ্যানেলে যাবে টাকা। কমবে দুর্নীতি।
বাংলাদেশের মতো কৃষিনির্ভর দেশে কৃষকের মুখে হাসি মানেই জাতীয় অর্থনীতির হাসি। আর সেই হাসি ফোটানোর এক বড় পদক্ষেপ হলো ‘কৃষক কার্ড’।
উদ্বোধন শেষে এখন চ্যালেঞ্জ হলো বাস্তবায়ন। প্রি-পাইলটিং, পাইলটিং ও পূর্ণাঙ্গ রোলআউট – প্রতিটি ধাপে ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা, ব্যাংক সংযুক্তি, তথ্য যাচাই ও কার্ড ডেলিভারি নিশ্চিত করতে হবে। তবে সরকারের দাবি, এর জন্য ইতিমধ্যে কৃষি মন্ত্রণালয়, তথ্য মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংক যৌথভাবে কাজ শুরু করেছে।
আশা করা যায়, আগামী চার বছর শেষে বাংলাদেশের প্রতিটি প্রান্তিক কৃষকের পকেটে থাকবে এই কৃষক কার্ড। আর সেই কার্ড তখন শুধু প্লাস্টিকের টুকরো নয় – হবে কৃষকের স্বাবলম্বী জীবনের চাবিকাঠি।
টাঙ্গাইলের শহীদ মারুফ স্টেডিয়াম থেকে শুরু হওয়া এই পথচলা একদিন গিয়ে দাঁড়াবে দেশের প্রতিটি গ্রামের প্রতিটি কৃষকের উঠোনে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাত ধরে উদ্বোধন হওয়া এই ‘কৃষক কার্ড’ যেন সত্যিই ঘুরিয়ে দেয় কৃষিজীবী মানুষের ভাগ্যের চাকা। এটাই সবার প্রত্যাশা।
কৃষক বাঁচলে বাঁচে দেশ – এই পুরনো সত্যটিকেই এবার দিয়েছে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় নতুন রূপ। এখন শুধু প্রয়োজন সুষ্ঠু বাস্তবায়ন আর কৃষকদের সচেতন অংশগ্রহণ। তবেই বাংলাদেশের কৃষি খাত পাবে নতুন মাত্রা। আর সেই মাত্রায় লেখা থাকবে – স্বীকৃতি, স্বচ্ছতা, স্বাবলম্বী কৃষক।

শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৪ এপ্রিল ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন