পবিত্র মসজিদে নববীর শহর মদিনা। রাসুলুল্লাহ ﷺ–এর স্মৃতিবিজড়িত এই নগরীতে বসবাস করে উচ্চশিক্ষা অর্জনের স্বপ্ন দেখেন বিশ্বের লাখো মুসলিম তরুণ। বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের মধ্যেও ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব মদিনা (Islamic University of Madinah) নিয়ে আগ্রহ বছরের পর বছর ধরে বেড়েই চলেছে।
সম্পূর্ণ অর্থায়িত স্কলারশিপ, মাসিক ভাতা, আবাসন সুবিধা, আন্তর্জাতিক পরিবেশ এবং ইসলামী জ্ঞানচর্চার অনন্য সুযোগ—সব মিলিয়ে এটি বিশ্বের অন্যতম আকর্ষণীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। তবে অনেকেই জানেন না, কীভাবে আবেদন করতে হবে, কী কী কাগজপত্র লাগবে, কত সময় লাগতে পারে কিংবা স্কলারশিপ পেলে পরবর্তী ধাপগুলো কী।
এই বিশেষ ফিচারে বাংলাদেশ থেকে মদিনা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার পুরো প্রক্রিয়া ধাপে ধাপে তুলে ধরা হলো।
১৯৬১ সালে সৌদি আরব সরকারের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব মদিনা। শুরুতে ইসলামী শিক্ষাকে কেন্দ্র করে কার্যক্রম পরিচালিত হলেও বর্তমানে এখানে প্রকৌশল, কম্পিউটার বিজ্ঞান এবং মৌলিক বিজ্ঞানসহ বিভিন্ন বিষয়ে উচ্চশিক্ষার সুযোগ রয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়টির বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো—
সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়ন;
আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী গ্রহণ;
পবিত্র মদিনা নগরীতে অবস্থান;
মাসিক ভাতা;
বিনামূল্যে আবাসনের ব্যবস্থা;
আরবি ভাষাভিত্তিক উচ্চশিক্ষা;
ইসলামী পরিবেশে শিক্ষার সুযোগ।
আবেদন করার আগে প্রথমেই নিশ্চিত হতে হবে যে আপনি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাথমিক যোগ্যতার শর্ত পূরণ করছেন কি না।
আবেদনকারীকে মুসলিম হতে হবে;
পুরুষ শিক্ষার্থী হতে হবে;
বয়স সাধারণত ১৭ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে হতে হবে;
এইচএসসি, আলিম বা সমমানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে;
সর্বশেষ শিক্ষাগত সনদ পাঁচ বছরের বেশি পুরোনো হওয়া যাবে না;
উত্তম চরিত্রের অধিকারী হতে হবে;
শারীরিকভাবে সুস্থ থাকতে হবে।
হাফেজে কোরআন;
আরবি ভাষায় দক্ষ শিক্ষার্থী;
ইসলামিক শিক্ষায় ভালো ফলাফলধারী;
মাদ্রাসা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী;
দ্বীনি কার্যক্রমে সম্পৃক্ত শিক্ষার্থী।
তবে সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের শিক্ষার্থীরাও আবেদন করতে পারবেন।
অনেক আবেদনকারী আবেদন করার আগ পর্যন্ত জানেন না, বিশ্ববিদ্যালয়টিতে আসলে কী কী বিষয়ে পড়ার সুযোগ রয়েছে।
শরিয়াহ
আকিদা ও দাওয়াহ
কোরআন ও ইসলামিক স্টাডিজ
হাদিস ও ইসলামিক স্টাডিজ
আরবি ভাষা
তড়িৎ প্রকৌশল
যন্ত্র প্রকৌশল
পুরকৌশল
কম্পিউটার বিজ্ঞান
তথ্যপ্রযুক্তি
ইনফরমেশন সিস্টেমস
পদার্থবিজ্ঞান
রসায়ন
গণিত
বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের সবচেয়ে বেশি সময় লাগে এই ধাপে।
বৈধ পাসপোর্ট;
জন্ম নিবন্ধন;
এসএসসি/দাখিল সনদ;
এসএসসি/দাখিল নম্বরপত্র;
এইচএসসি/আলিম সনদ;
এইচএসসি/আলিম নম্বরপত্র;
আচরণগত সনদ;
পাসপোর্ট সাইজের ছবি।
হিফজ সনদ;
আরবি ভাষা প্রশিক্ষণের সনদ;
মেডিকেল ফিটনেস সনদ;
ইসলামি ব্যক্তিত্বের সুপারিশপত্র;
অতিরিক্ত কোর্সের সনদ।
অনেক আবেদনকারী এই ধাপে ভুল করেন।
সাধারণত যেসব কাগজপত্র বাংলায় থাকে, সেগুলো ইংরেজি বা আরবিতে অনুবাদ করতে হতে পারে।
প্রয়োজন হতে পারে—
নোটারি;
শিক্ষা বোর্ড কর্তৃক সত্যায়ন;
শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক সত্যায়ন;
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্তৃক সত্যায়ন।
তবে প্রতি বছর নীতিমালায় কিছু পরিবর্তন আসতে পারে। তাই আবেদনপূর্ব নির্দেশিকা ভালোভাবে পড়ে নিতে হবে।
বর্তমানে সৌদি সরকারের কেন্দ্রীয় প্ল্যাটফর্ম Study in Saudi –এর মাধ্যমে আবেদন কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
আবেদনের ধাপ—
অ্যাকাউন্ট তৈরি করুন।
ব্যক্তিগত তথ্য পূরণ করুন।
শিক্ষাগত তথ্য যুক্ত করুন।
প্রয়োজনীয় নথি আপলোড করুন।
আবেদন পর্যালোচনা করুন।
চূড়ান্তভাবে আবেদন জমা দিন।
মদিনা ইসলামী ইউনির্ভার্সিটির ক্যাম্পাস
এটাই সবচেয়ে কঠিন ধাপ।
আবেদন জমা দেওয়ার পর অনেকেই ভাবেন কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ফলাফল চলে আসবে। বাস্তবে তা নাও হতে পারে।
সাবেক শিক্ষার্থীদের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী—
কারও ক্ষেত্রে ৬ মাস;
কারও ক্ষেত্রে ১ বছর;
আবার কারও ক্ষেত্রে ২–৩ বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
তাই ধৈর্য রাখা জরুরি।
নির্বাচিত প্রার্থীদের সাধারণত ই-মেইলের মাধ্যমে জানানো হয়।
তাই—
স্প্যাম ফোল্ডার পরীক্ষা করুন;
নিয়মিত লগইন করুন;
যোগাযোগের তথ্য হালনাগাদ রাখুন।
সব আবেদনকারীর সাক্ষাৎকার নেওয়া না হলেও অনেক ক্ষেত্রে অনলাইন সাক্ষাৎকার অনুষ্ঠিত হয়।
আপনার নাম কী?
কোথা থেকে এসেছেন?
কেন মদিনা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে চান?
ইসলামের মৌলিক বিষয়;
ঈমানের স্তম্ভ;
নামাজের ফরজ;
নবী-রাসুল সম্পর্কিত প্রশ্ন।
সাধারণ পরিচয় দেওয়া;
সহজ প্রশ্নের উত্তর দেওয়া।
চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হওয়ার পর শুরু হয় ভিসা কার্যক্রম।
সাধারণত বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেয়।
এই ধাপে প্রয়োজন হতে পারে—
মূল সনদপত্র;
মেডিকেল পরীক্ষা;
পুলিশ ক্লিয়ারেন্স;
পাসপোর্ট জমা দেওয়া।
ভিসা সম্পন্ন হলে যাত্রার প্রস্তুতি নিতে হবে।
মূল কাগজপত্র;
পাসপোর্টের কপি;
প্রয়োজনীয় পোশাক;
কিছু ব্যক্তিগত ওষুধ;
প্রয়োজনীয় ইলেকট্রনিক ডিভাইস।
মদিনা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক স্কলারশিপ বিশ্বের অন্যতম আকর্ষণীয় শিক্ষা বৃত্তি হিসেবে পরিচিত।
সম্পূর্ণ টিউশন ফি মওকুফ;
শিক্ষাসামগ্রী সহায়তা।
মাসিক ভাতা;
মেধাবীদের জন্য অতিরিক্ত প্রণোদনা।
অবিবাহিত শিক্ষার্থীদের জন্য আবাসন;
আসবাবপত্রসহ থাকার ব্যবস্থা।
বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে চিকিৎসা;
প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা।
মসজিদে নববীতে যাতায়াতের সুযোগ;
উমরাহ ভ্রমণের ব্যবস্থা।
স্কলারশিপ পেলে মূল শিক্ষাব্যয় থাকে না।
তবে বাংলাদেশ থেকে প্রাথমিক প্রস্তুতিতে খরচ হতে পারে—
| খাত | আনুমানিক ব্যয় |
|---|---|
| পাসপোর্ট | ৬–১২ হাজার টাকা |
| অনুবাদ ও নোটারি | ২–৫ হাজার টাকা |
| সত্যায়ন | ১–৩ হাজার টাকা |
| মেডিকেল | ১–৩ হাজার টাকা |
| অন্যান্য | ২–৫ হাজার টাকা |
সব মিলিয়ে প্রায় ১০ থেকে ৩০ হাজার টাকা প্রয়োজন হতে পারে।
পড়াশোনার মাধ্যম আরবি হওয়ায় ভাষাগত দক্ষতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা প্রয়োজন।
ইবাদত, পড়াশোনা এবং ব্যক্তিগত জীবনের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করতে হয়।
আবেদনের আগেই আরবিতে কথোপকথনের অনুশীলন করুন।
হিফজ বা তিলাওয়াতের দক্ষতা আত্মবিশ্বাস বাড়ায়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাব্যবস্থা অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক।
নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা জরুরি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো অনুমোদিত এজেন্ট নেই।
তাই—
"নিশ্চিত ভর্তি" দেওয়ার নামে অর্থ দাবি;
ভুয়া অফার লেটার;
অতিরিক্ত প্রসেসিং ফি দাবি—
এসব বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।
আবেদন অবশ্যই অফিসিয়াল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে করতে হবে।
বাংলাদেশি সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী—
শুরুতে আরবি ভাষা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ;
আন্তর্জাতিক পরিবেশ দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেয়;
আত্মনিয়ন্ত্রণ ও সময় ব্যবস্থাপনা খুব গুরুত্বপূর্ণ;
ইসলামী জ্ঞানচর্চার পাশাপাশি আধুনিক শিক্ষার সুযোগ রয়েছে;
মসজিদে নববীর নিকটবর্তী পরিবেশ শিক্ষার্থীদের আধ্যাত্মিক জীবনেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
✓ পাসপোর্ট তৈরি হয়েছে
✓ এসএসসি ও এইচএসসি সনদ প্রস্তুত
✓ নম্বরপত্র সংগ্রহ করা হয়েছে
✓ জন্ম নিবন্ধন হালনাগাদ
✓ ছবি প্রস্তুত
✓ প্রয়োজনীয় অনুবাদ সম্পন্ন
✓ আরবি ভাষার প্রাথমিক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে
✓ অফিসিয়াল ওয়েবসাইট নিয়মিত দেখা হচ্ছে
মদিনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া নিঃসন্দেহে সহজ নয়। প্রতি বছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে অসংখ্য শিক্ষার্থী আবেদন করেন। তবে সঠিক প্রস্তুতি, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, ধৈর্য এবং আন্তরিক প্রচেষ্টা থাকলে বাংলাদেশের একজন শিক্ষার্থীর পক্ষেও এই স্বপ্ন পূরণ করা সম্ভব।
অনেক বাংলাদেশি শিক্ষার্থী ইতোমধ্যেই মদিনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে দেশে ফিরে ইসলামি শিক্ষা, গবেষণা, দাওয়াহ ও বিভিন্ন পেশাগত ক্ষেত্রে অবদান রাখছেন। নতুন প্রজন্মের জন্যও এটি হতে পারে জ্ঞানার্জন, আত্মগঠন এবং বিশ্বমানের শিক্ষার এক অনন্য দ্বার।
২০২৬ সালের আবেদনকারীদের জন্য এখনই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো—তথ্য যাচাই করা, প্রয়োজনীয় নথি প্রস্তুত করা এবং সময়মতো আবেদন সম্পন্ন করা।
পবিত্র মদিনার পথে যাত্রা হয়তো শুরু হবে একটি অনলাইন আবেদন দিয়েই; কিন্তু সেই যাত্রা বদলে দিতে পারে একজন শিক্ষার্থীর পুরো জীবন।
বিষয় : সৌদি আরব মদিনা বিশ্ববিদ্যালয়

মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৬ জুন ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন