‘নিউ গাজা’ পরিকল্পনা: গাজার ইতিহাস মুছে ফেলার আরেক নাম?
বিশ্লেষকদের মতে, ঝকঝকে আকাশচুম্বী ভবন ও বিলাসবহুল উপকূলীয় পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তোলার যে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, তা উপসাগরীয় দেশগুলোর আদলে তৈরি—যার লক্ষ্য গাজার ঐতিহ্য ও ফিলিস্তিনি পরিচয় মুছে ফেলা।২২ জানুয়ারি সুইজারল্যান্ডের দাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত জ্যারেড কুশনার ‘নিউ গাজা’ নামের এক পরিকল্পনা উপস্থাপন করেন। সেখানে তিনি গাজাকে একটি “ফ্রি মার্কেট ইকোনমি”-ভিত্তিক অঞ্চলে রূপান্তরের কথা বলেন, যেখানে থাকবে চকচকে স্কাইস্ক্র্যাপার, পর্যটন এলাকা এবং ব্যবসা ও বাণিজ্যের জন্য আলাদা জেলা।কুশনার জানান, এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অনুসরণ করা হবে ট্রাম্পের আমেরিকার “একই মানসিকতা ও একই পদ্ধতি”।তবে এই প্রস্তাবকে ঘিরে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি যুদ্ধ ও গণহত্যা থেকে মুনাফা লোটার আরেকটি উদাহরণ।ব্রিটিশ-ইসরায়েলি বিশ্লেষক ও সাবেক শান্তি আলোচক ড্যানিয়েল লেভি বলেন,“এই গণহত্যা থেকে আগেও মানুষ অর্থ উপার্জন করেছে, আর এই পরিকল্পনা সেই ধারাবাহিকতারই অংশ।”গাজায় চলমান যুদ্ধে এ পর্যন্ত ৭১ হাজার ৫০০-এর বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। জাতিসংঘ, গণহত্যা বিশেষজ্ঞ ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো এই যুদ্ধকে ‘গণহত্যা’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।লেভি উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন গাজা হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশনের কথা—যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের উদ্যোগে গঠিত এই প্রকল্পে বেসরকারি ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে ত্রাণ বিতরণকে “মুনাফাভিত্তিক মৃত্যুফাঁদে” পরিণত করার অভিযোগ রয়েছে।পিটার ডি উইটের আঁকা কার্টুন 'গাজা বিচ ২০৩০'। ছবি- এক্সজাফাভিত্তিক ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক বিশ্লেষক আবেদ আবু শাহদেহ বলেন,“নাওমি ক্লাইনের দ্য শক ডকট্রিন বইটি এই পরিস্থিতিকে নিখুঁতভাবে ব্যাখ্যা করে। করপোরেশনগুলো দুর্যোগকে বিনিয়োগের সুযোগ হিসেবে দেখে।”তার ভাষায়,“আমরা মানুষের মৃত্যুতে ট্র্যাজেডি দেখি, আর তারা দেখে জমি, ঘর আর অধিকার দখলের সুযোগ।”তিনি জানান, এই পরিকল্পনা থেকে শুধু মার্কিন বা ইসরায়েলি নয়—আরব দেশগুলোর ব্যবসায়ী এমনকি কিছু ধনী ফিলিস্তিনিও লাভবান হতে পারে।“কিন্তু শেষ পর্যন্ত ফিলিস্তিনি জনগণই থাকবে বাইরে,” বলেন তিনি।প্রখ্যাত ব্রিটিশ-ইসরায়েলি ইতিহাসবিদ আভি শ্লাইম এই পরিকল্পনাকে “অশোভন ও ঔপনিবেশিক” আখ্যা দেন।তার মতে,“সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো—এই পরিকল্পনায় ফিলিস্তিনিদের কোনো ভূমিকাই নেই।”দাভোসে প্রদর্শিত কুশনারের স্লাইডে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় তৈরি গাজার নকশায় দেখা যায় কাচে মোড়া আকাশচুম্বী ভবন, আরব পোশাক পরা মানুষ—যা ফিলিস্তিনি স্থাপত্য, ইতিহাস বা সংস্কৃতির সঙ্গে কোনোভাবেই মেলে না। বরং তা উপসাগরীয় শহরের মতো।বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প ও কুশনারের উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণেই এমন নকশা উঠে এসেছে। হোয়াইট হাউস ছাড়ার পর কুশনারের বিনিয়োগ সংস্থা সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার ও সৌদি আরব থেকে বিপুল অর্থ পেয়েছে বলেও জানা যায়।ড্যানিয়েল লেভি বলেন,“তারা সম্পত্তি উন্নয়নের ভাষা জানে, কিন্তু কমিউনিটি বা মানুষের ভূমির সঙ্গে সম্পর্ক বোঝে না।”তিনি আরও উল্লেখ করেন, ঠিক এই সময়েই পূর্ব জেরুজালেমে ইসরায়েলি বুলডোজার দিয়ে ফিলিস্তিনি শরণার্থীবিষয়ক জাতিসংঘ সংস্থা ইউএনআরডব্লিউএর সদর দপ্তর ধ্বংস করা হচ্ছিল।“দুটোর লক্ষ্য এক—মানুষের ভূমির সঙ্গে সম্পর্ক মুছে ফেলা।”বিশ্লেষকদের বেশিরভাগই মনে করেন, বাস্তবে এমন ‘ফ্রি মার্কেট গাজা’ প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা খুবই কম। কারণ কুশনার বলেছেন, হামাস পুরোপুরি নিরস্ত্রীকরণ না হলে পুনর্গঠন শুরু হবে না।সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর কর্মকর্তা অ্যানেল শেলিন বলেন,“স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ছাড়া হামাস অস্ত্র সমর্পণ করবে—এমন সম্ভাবনা নেই।”তার মতে, আন্তর্জাতিক আইন উপেক্ষা করেও ইসরায়েল হামাসকে পরাজিত বা নিরস্ত্র করতে পারেনি।“তাহলে অন্য কেউ কীভাবে পারবে?”—প্রশ্ন তোলেন তিনি।শেলিন আরও বলেন,“ইরাক ও আফগানিস্তানের ব্যর্থতা ট্রাম্পের মনে রাখা উচিত—সেই অভিজ্ঞতাই তাকে যুদ্ধবিরোধী ভোটারদের কাছে জনপ্রিয় করেছিল।”